তারেকের ফেরায় বাধা নিরাপত্তা

 গুলশানের বাসাকে নিরাপদ মনে করছেন না গোয়েন্দারা  বিদেশি গোয়েন্দাদের ষড়যন্ত্রের আভাস

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১১:৩৬ এএম

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির শুরুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আগামী সপ্তাহ দু-একের মধ্যেই এ নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার কথা। ভোটের মাঠে এবার বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। লন্ডনে ১৭ বছর নির্বাসনে থাকা এই নেতা কবে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে দলে, সরকারে ও দলের বাইরে আছে নানামুখী আলোচনা। তবে এ বিষয়ে সর্বশেষ গতকাল শনিবার তারেক নিজে যে বিবৃতি দিলেন, তাতে তিনি ঠিক কবে ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে অস্পষ্টতা বেড়েছে।

রাজধানীর একটি হাসপাতালে শয্যাশায়ী মা ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থায় আবারও তারেক রহমানের ফেরার সম্ভাবনা দেখতে পান অনেকে। তবে তার বিবৃতিতে বিস্মিত হন বহু লোক। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত এখনো তার ‘একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’।

তারেক বলেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহস্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এ বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।’

তারেক বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই তিনি স্বদেশে ফিরবেন।

বিএনপির এ শীর্ষনেতার এমন বক্তব্যে সরকারের অনেকে হতবাক। এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা খুঁজছেন দলের ভেতরে-বাইরেও অনেকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের তো সবদিক থেকে বিবেচনা করেই তার আসার বিষয় ঠিক করতে হবে। অনেকগুলো বিষয় থাকতে পারে এখানে। সবগুলো বিবেচনায় এনে তার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।’

গয়েশ^র বলেন, তারেক রহমানের ফের দলের জন্য প্রয়োজন, দেশেরও প্রয়োজন এটা তো তিনি (তারেক) অনুভব করেন। কিন্তু অনেক টেকনিক্যাল ইস্যু আছে, ওইগুলো বলা যাচ্ছে না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তার ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতো নেতার নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবে আছেই। আর তার আসার আগে প্রস্তুতির বিষয়ও আছে। তিনি বলেন, ১৫ বছর একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। পুলিশকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর এক অংশকেও দলীয়করণের চেষ্টা হয়েছে। এমন অবস্থায়, ‘সরকারকে একটা নিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা নিরাপদ বোধ করবেন।’

পুলিশের একটি ইউনিটের গোপন নোটে অবশ্য তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এতে বলা হয়, তারেক রহমানের জন্য রাজধানীর গুলশানে যে বাসভবনটি প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটিকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর তার নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের লাইসেন্সের যে অনুমতি চাওয়া হয়েছে, তা এখনো মেলেনি। এর বাইরে, বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করতে তার বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি এজেন্টদের ষড়যন্ত্রকেও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিষয় আগে-ভাগেই জানানো হয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। গোয়েন্দাদের এই সতর্কতার কারণে মা খালেদা জিয়ার চরম অসুস্থতার মধ্যেও তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না।

তারেক রহমানের জন্য গুলশানের যে বাসাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, সেখানে তার নিরাপত্তা নিয়েও সন্দেহের কথা জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় তারেক রহমানকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। পরে তিনি লন্ডন চলে যান। তবে তিনি নিরাপত্তাঝুঁকিতে আছেন। বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সার্বিক পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনার অনুমতি দিয়েছে। একটি তার (তারেক) নিজ ব্যবহারের জন্য। অন্যটি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতির জন্যও বিএনপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। এতে একটি শটগান ও দুটি পিস্তলের লাইসেন্স চাওয়া হয়েছে। লাইসেন্সগুলো দ্রুত দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়া এক অস্থির রাজনৈতিক ভূখণ্ড, যেখানে জাতীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ড বা হত্যাচেষ্টার ঘটনা বারবার ঘটেছে। বিশেষ করে, নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক পরিস্থিতি ও সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের বিবৃতিতে সরকারের ওপর তার আস্থার ঘাটতির বিষয়টি চলে এসেছে। এ কারণে দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণ করে দেশে ফেরার পথ সুগম করে দেওয়াটা সরকারেরই দায়িত্ব।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম অবশ্য গতকালই বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার ব্যাপারে সরকারের কোনো বিধিনিষেধ নেই।

এ বিষয়ে পুলিশের গোপনীয় শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সবসময়ই বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তাঝুঁকি থাকে। সে অনুযায়ী গোয়েন্দারা তাদের সতর্ক করেও ব্যবস্থা নেন। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বিষয়ে একটি রাজনৈতিক দল ও পাশের একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার অপতৎপরতা দেখা গেছে। বিষয়টি তাকে জানানো হয়েছে। সেখানে কোন ধরনের ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে, তাও জানানো হয়েছে। বিষয়টি তিনি (তারেক) গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলেছেন।

তিনি আরও বলেন, কয়েক মাস আগেই একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে সতর্ক করলেও, তা এতদিন ফাইলচাপা ছিল। এরপর নড়েচড়ে বসেন সরকারের ঊর্ধ্বতনরা। এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে ফের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।

পুলিশের সাবেক এক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলাগুলো ছিল, সেগুলো এখন আর নেই। তাহলে আইনগত কোনো বাধা না থাকলে অন্য বাধাগুলোর দ্রুত সমাধান করে সরকার আস্থা-অনাস্থার বিষয়টি সমাধান করতে পারে। তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধানে সরকারের সদিচ্ছার কথা এতদিন বলা হয়েছে। কিন্তু তারেক রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে তা মিলছে। এতদিন ধরে মানুষ মনে করেছিল, তারেক রহমান নিজে আসছেন না। গতকাল তারেক রহমানের বক্তব্যে একটা ধোঁয়াশা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার আসাটা শুধু তার ওপরই নির্ভর করছে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার সবুজসংকেত না দেয়। তিনি বলেন, তারেক রহমান দেশে আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীরাও তার নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবেন। তারা নিজেরাও আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখবেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের তারিখটা ঘোষণা হোক। বাংলাদেশের মানুষ ওনাকে এ বছরেই পাবে ইনশাআল্লাহ।’

হুমায়ুন কবির বলেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তার ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতো নেতার নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবে আছেই। আর তার আসার আগে প্রস্তুতির বিষয়ও আছে। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। পুলিশকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর এক অংশকেও দলীয়করণের চেষ্টা হয়েছে। এমন অবস্থায়, ‘সরকারকে একটা নিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা নিরাপদ বোধ করবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত