ব্যবসা, বিনিয়োগে পুরনো ধারা বদলে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা চাইলেন নির্বিঘœ-নিরাপদ পরিবেশ। ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা তুলে ধরলেন অর্থনীতির আগের, চলতি সমস্যা ও সম্ভাবনা। রাজনীতিবিদরা দিলেন ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বাতলে দিলেন নানা পথ। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে অর্থনীতিতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অর্থনীতির অচলাবস্থা সচলায়তনের বিষয়ে গুরুত্ব দিলেন প্রায় সবাই। একই সঙ্গে ব্যাংক লুটেরা ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান এসেছে বক্তাদের মুখে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য কেমন হতে পারে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের বেশি সময়ের সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরা হয় ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫’-এ। ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শিরোনামে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, আর্থিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে দেশের আর্থিক খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিভিন্ন দিক নিয়ে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে সকাল ১০টা থেকে প্রায় দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে বণিক বার্তা।
সম্মেলনটি তিনটি অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। ‘ব্যবসা বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ শিরোনামে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। দ্বিতীয় অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয় ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকরণ’ শিরোনামে। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ‘অর্থনীতিতে ন্যায্যতা’ শিরোনামে তৃতীয় অধিবেশনটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সবশেষ চতুর্থ অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয় ‘অভ্যুত্থানের অর্থনৈতিক আকাক্সক্ষা’ শিরোনামে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
খেলাপি ঋণের সংকট কাটাতে ৫ থেকে ১০ বছর : গভর্নর
সম্মেলনে শিল্পায়নের দুরবস্থা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, দেশে ব্যাংক খাতের ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বর্তমানে খেলাপি ঋণ। আর এই খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে উঠতে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। তবে, আগামী রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ঋণপত্র খোলা ও পণ্য আমদানির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আশ^স্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘এই পরিস্থিতি রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে বহুদিন এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। ধাপে ধাপে এগোতে হবে। পুরোপুরি উত্তরণে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে।’
গভর্নর আরও বলেন, ব্যাংক খাতের এই দুরবস্থার জন্য দায়ী বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনীতিকরণ করা।
সম্মেলনে হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা উদ্বেগজনক। আমরা ক্রমেই নিচের দিকে নামছি। সুদের হার অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে আস্থা ফিরবে না। রাজনীতিবিদদের কাছে অনুরোধ থাকবে, আপনারা প্রাইভেট সেক্টরকে পরামর্শ করবেন।’
লুটেরাদের ধরুন, কারখানা বন্ধ নয় : মির্জা ফখরুল
অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে আসলে চিন্তাভাবনাটাও পরিবর্তন করা দরকার। গত ১৫ বছর যারা লুট করেছেন, চুরি করেছেন, ব্যাংক ডাকাতি করেছেন। লুটপাট করে নিয়ে চলে গেছেন। তাদের ধরেন, তাদের শাস্তি দেন। তাদের যে শিল্প-কারখানা আছে, সেগুলোতে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। সেগুলো বন্ধ করার কারণে ইতিমধ্যে ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়ে গেছে। এই লোকগুলো যাবে কোথায়? এই বেকারত্বটা আমরা সৃষ্টি করছি কেন? বিষয়টা আমাদের আবার ভেবে দেখা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কারখানাগুলো আমরা কীভাবে চালু করতে পারি, এই প্রতিষ্ঠানগুলো, মানুষগুলোর জন্য কীভাবে কর্মসংস্থানে সৃষ্টি করতে পারি, সেটি আমাদের দেখা দরকার।’
বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন দলটির মহাসচিব। তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যে বিষয়গুলোর ওপর আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই, সেটা হচ্ছে সাধারণ মানুষগুলো যেন ভালো থাকেন। আমাদের কৃষকরা যেন ভালো থাকেন, তার সমস্যার সমাধান যেন করা যায়, আমাদের শ্রমিকরা যেন তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য পান। অর্থনীতিতে যেন একটা স্থিতি অবস্থা থাকে।’ এ ছাড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও এবং শিক্ষা খাতকে আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দেন মির্জা ফখরুল।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনীতিকে সব শ্রেণির নাগরিকের কাছে পৌঁছানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির সুফল জনগণের কাছে না গিয়ে একটা গোষ্ঠীর কাছে গিয়েছে। একটা অর্গাইজডের কাছে গিয়েছে। শুধু রাজনীতিকে গণতন্ত্রায়ণ নয়, অর্থনীতিকেও গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে হবে। অর্থনীতিতে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।’
আমীর খসরু বলেন, বিনিয়োগ ও পরিবেশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ দুটো বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
গণসংহতির সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, অর্থনীতিতে বাংলাদেশ যে কিছুটা উন্নতি করেছে, এর কারণ উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতা। কিন্তু একটা লাইসেন্স করতে গিয়ে যদি সরকারি দপ্তরে ঘুষ দিতে হয়, ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি হয় ওই ব্যক্তির আয়ে ভাগ বসানো। তিনি বলেন, জনগণের জীবনমান বাড়াতে হবে। যেকোনো অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হবেন প্রান্তিক মানুষ, এমন মানসিকতা থাকতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, দুর্নীতির জন্য রাজনীতিবিদদের এককভাবে দায়ী করা যাবে না। নির্বাচনে কালো টাকা বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতির নেক্সাসকে ভাঙতে হবে। না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ব একটি বার্তা পাবে যে এই দেশ স্থিতিশীল হবে কি না একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ট্রানজিশনটা ‘পিসফুল ওয়ে’তে যাবে কি না। আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পিসফুলি এই ট্রানজিশনটা ঘটানো। যদি এটি পিসফুলি না হয়, তাহলে অস্থিতিশীলতা থেকেই যাবে।
দুর্বৃত্তায়নে সহযোগিতা করে রাষ্ট্র : ডা. শফিকুর রহমান
সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘অর্থনীতিতে লালফিতার দৌরাত্ম্য যেমন আছে, তেমনি দুর্বৃত্তানও আছে। ক্ষেত্রবিশেষে এই দুর্বৃত্তায়নকে সহায়তা করে রাষ্ট্র। ফলে সাধারণের যেসব কাজ করতে অল্প সময় লাগার কথা, সেগুলোতে ৫-১০ বছর লাগছে। এই দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় ব্যবসায়ীদের বলা হয় সুবিধাবাদী। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা লাইন দেয়। লাইন ছাড়া উপায়ও নেই। আর এ দায় রাজনীতিবিদদের। ব্যবসায়ীরা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাদের জন্য একটি কমফোর্ট জোন আমরা তৈরি করতে পারিনি।’
নির্বাচনী অঙ্গনটা অস্বচ্ছ : বদিউল আলম মজুমদার
অনুষ্ঠানে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘অনেক আন্দোলনের পরও গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব কি না এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের পথে বড় বাধা হলো নির্বাচনী অঙ্গনের অস্বচ্ছতা। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনও পরিচ্ছন্ন নয়। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে টাকার খেলা। টাকা দিয়ে কেনা যায় এ রকম এক ধরনের গণতন্ত্রই মনে হয় আমরা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক, বিএসএমএর সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন প্রমুখ।
