পাবনার ঈশ্বরদীতে সদ্যোজাত আটটি কুকুরছানাকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার অভিযোগে এক কর্মকর্তাকে তার বরাদ্দকৃত সরকারি বাসা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত সোমবার বিকেলে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম চত্বরে জরুরি বৈঠক শেষে এ নির্দেশ দেন ইউএনও মো. মনিরুজ্জামান। অভিযুক্ত হাসানুর রহমান নয়ন ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ঈশ্বরদী উপজেলা কর্মকর্তা। তিনি উপজেলা পরিষদ ক্যাম্পাসের সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সপ্তাহখানেক আগে ওই কর্মকর্তার বাসার আঙিনায় একটি কুকুর আটটি ছানা জন্ম দেয়। গত সোমবার হঠাৎ মা কুকুরকে পরিষদ চত্বরে ছোটাছুটি ও কান্নারত দেখা যায়। একপর্যায়ে স্থানীয়রা পুকুর থেকে বস্তাবন্দি মৃত ছানাগুলো তুলে আনলে, মা কুকুর পাশে বসে আর্তনাদ করে। পরে সেগুলো মাটিচাপা দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাড়ির কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সোমবার সকালে নয়ন স্যার মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। আমি ছানাগুলোর কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি কিছু জানেন না বলেন। তখন তার ছেলে বলে ‘আম্মু ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দিয়েছে।’ এরপর আমরা পুকুরে গিয়ে একটি বস্তা ভাসতে দেখি। তুলে খোলার পর আটটি ছানাকেই মৃত অবস্থায় পাই।’
মৃত ছানাগুলো দেখে মা কুকুরটি প্রচন্ড আর্তনাদ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মীরা কুকুরটিকে চিকিৎসা দেন এবং সেডেটিভ ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।
ঈশ্বরদীর ইউএনও বলেন, ‘এটি চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ। শাস্তি হিসেবে ওই কর্মকর্তাকে এক দিনের মধ্যে সরকারি কোয়ার্টার ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।’ মা কুকুরটির চিকিৎসার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জানা যায়, ঈশ্বরদীর বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা সুবীর কুমার দাশ লালনপালন করতেন মা কুকুরটি, ডাকতেন লাল্টু নামে। তিনি চলে যাওয়ার পর ছানাদের নিয়ে অনেকটা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে কুকুরটি। খাবারের জন্য বারবার ধরণা দেয় ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক হাসানুর রহমান বাড়ির দরজায়। এতে বিরক্ত হয়ে বস্তাবন্দি করে ছানাগুলো পুকুরে ফেলে দেন তার স্ত্রী। এ ঘটনায় ফেসবুকে ঈশ্বরদীর সাবেক ইউএনও সুবীর কুমার দাশ লিখেছেন, ‘সভ্য মানবজাতির জন্য এ ধরনের কাজ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আমার সাবেক কর্মস্থলে আমার পোষা কুকুর ছিল, যার একটির নাম লাল্টু। তার জন্ম থেকে আমি লালন পালন করেছি।’
তিনি লেখেন, ‘আমার বদলির পর সেখানে কুকুরছানাদের ওপর অন্ধকার নেমে আসে। সকালে শুনেছি, উপজেলা পরিষদের এক সরকারি কর্মকর্তা ও তার পরিবার ছানাগুলোকে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যা করেছেন। আমি বর্তমান সরকারের কাছে এই হত্যার বিচার চেয়েছি এবং সবাইকে বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই।’ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন প্রাণী সংরক্ষণ কর্মীরা। পাবনা নেচার অ্যান্ড ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন কমিউনিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এটি চরম অমানবিক। কোনো মানুষ এমন কাজ করতে পারে, আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি ছানাগুলো হত্যায় জড়িত ব্যক্তির শাস্তি চাই।’
পাবনার সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রাণী অধিকার আইনে মালিকবিহীন কোনো পশুকে হত্যা করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা নিয়মিত আদালতে শাস্তির বিধান রয়েছে। এতে ছয় মাসের কারাদ- এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কিন্তু সচরাচর এর প্রয়োগের নজির নেই। আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।’
