বাংলার মাটি ইতিহাসে সমৃদ্ধ। রাজা-বাদশাহ, নবাব-জমিদারের কীর্তিচিহ্ন ছড়িয়ে আছে দেশ জুড়ে। সেই ইতিহাসের উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার প্রাচীন ও বিখ্যাত ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি। এ বাড়িটি শুধু স্থাপত্যের সৌন্দর্য নয়, বরং এটি এক সময়ের রাজকীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
ধনবাড়ী জমিদারবাড়ির স্থাপত্যে মোগল, ইউরোপীয় ও স্থানীয় নকশার এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়। প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে উঁচু গেট, প্রশস্ত উঠান, ঝলমলে বারান্দা, নকশাকাটা দরজা, চিত্তাকর্ষক জানালা এবং রাজকীয় আসবাবপত্র। বাড়ির প্রধান অংশে রয়েছে নবাবের আসনকক্ষ, বৈঠকখানা, নায়েবঘর, কাচারিঘর, পাইক-পেয়াদার বসতি, দাস-দাসীর চত্বর এবং সবুজেঘেরা বিস্তীর্ণ বাগান। সব মিলিয়ে এলাহী কা-। পুরো প্রাঙ্গণটি যেন নীরবে বলে দেয়, এক সময়ের ঐশ্বর্য ও গৌরবের গল্প। শতবর্ষী দেয়ালগুলোর ক্ষয়ে পড়া চুন-সুরকির আস্তরণেও লুকিয়ে আছে বিস্মৃত রাজকীয় ঐতিহ্যের ছাপ। কারুকার্যখচিত ভবনগুলোর প্রতিটি কোণেই রয়েছে সৌন্দর্যের সূক্ষ্ম ছোঁয়া। এ ছাড়াও দৃষ্টিনন্দন বাগানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল, ফল ও গাছের সমারোহ; যা মন মাতিয়ে দেয়।
এই জমিদারবাড়ির ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরনো। জানা যায়, ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জমিদারবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্ট সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী এবং ইংরেজ আমলের খ্যাতনামা জমিদার খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রথম মুসলিম মন্ত্রী। এই জমিদারবাড়িটি ছিল তার প্রিয় আবাসস্থল; এখান থেকেই তিনি রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণের নানা কর্মকা- পরিচালনা করতেন।
এ জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ধনপতি সিংহকে পরাজিত করে সেনাপতি ইস্পিঞ্জর খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়ীতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিয়ে করেন বগুড়ার নবাব আবদুস সোবহানের মেয়ে আলতাফুন্নাহারকে। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর নবাব বিয়ে করেন ঈশা খাঁর শেষ বংশধর সৈয়দা আখতার খাতুনকে। নওয়াব আলী চৌধুরীর তৃতীয় স্ত্রীর নাম ছিল সকিনা খাতুন। ১৯২৯ সালে নওয়াব আলী চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। নবাব তার ওয়াকফনামায় তৃতীয় স্ত্রীর একমাত্র ছেলে সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী এবং মেয়ে উম্মে ফাতেমা হুমায়রা খাতুনের নাম উল্লেখ করে যান। সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জমিদারবাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী তার একমাত্র সন্তান নবাবজাদা সৈয়দা আশিকা আকবরের ছেলে আফিফ উদ্দিন আহমাদ। তিনিই বর্তমানে এটি দেখাশোনা করছেন।
১৭ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ পর্যটকদের জন্য ক্রমেই আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। আজ এটি ধনবাড়ী নবাব মঞ্জিল বা নবাব প্যালেস রিসোর্ট নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে পিকনিক স্পট, থাকার সুব্যবস্থা এবং আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। ১৪ গম্বুজবিশিষ্ট মুঘল স্থাপত্যের নবাব প্যালেসের চারদিকে রয়েছে উঁচু প্রাচীর। দক্ষিণমুখী প্রাসাদের পূর্বদিকে রয়েছে এক বিশাল তোরণ, যা নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ গভর্নরকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেন।
প্রাচীরঘেরা প্যালেসটির পাশেই রয়েছে প্রায় ৩০ বিঘা আয়তনের দৃষ্টিনন্দন এক দীঘি। দীঘিটিতে সুন্দর ও মনোরম শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। ইচ্ছা করলে শৌখিন ভ্রমণপ্রেমীরা এখানে নৌকা ভ্রমণ ও মাছ ধরতে পারেন। দর্শনার্থীদের জন্য দীঘিতে রয়েছে দুটি সাম্পান; যে কেউ চাইলে উঠতে পারেন। তা ছাড়া নবাবী স্টাইলে পুরো রিসোর্ট ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা।
ধনবাড়ী জমিদারবাড়ির অন্যতম স্থাপত্য হলো ৭০০ বছরের পুরনো নওয়াব শাহী জামে মসজিদ। বলা হয়ে থাকে, সেলজুক তুর্কি বংশের ইস্পিঞ্জর খাঁ ও মনোয়ার খাঁ মসজিদটির মূল কাঠামো নির্মাণ করেন। পরে খান বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন। মসজিদটি প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর অবস্থিত। সংস্কারের আগে এটি ছিল আয়তাকার; বর্তমানে এটি বর্গাকৃতির এবং সাধারণ তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকার মোঘল মসজিদের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। সংস্কারের পর মসজিদের প্রাচীনত্ব কিছুটা লোপ পেলেও এর চাকচিক্য ও সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। সুন্দর কারুকার্যময় এ মসজিদের পূর্ব দিকে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ এবং উত্তর-দক্ষিণে আরও একটি করে, মোট পাঁচটি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটির অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো সুউচ্চ ৩০ ফুট মিনারের চূড়ার ১০টি তামার চাঁদ, যা মিনারের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের সংরক্ষিত কক্ষে শোভা পাচ্ছে ১৮টি হাঁড়িবাতি। যা নারিকেল তেল দ্বারা আলোকসজ্জার কাজে ব্যবহৃত হতো। রয়েছে মোগল আমলের ব্যবহৃত তিনটি ঝাড়বাতিও। মসজিদের পাশেই রয়েছে কবরস্থান। খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীকে এখানেই সমাহিত করা হয়েছে। নওয়াবের ওয়াকফকৃত সম্পদ দ্বারা এই মসজিদ ও পাশে অবস্থিত মাদ্রাসাটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
ইতিহাসের সাক্ষী হতে সারা বছরই এখানে কমবেশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় থাকে, তবে ডিসেম্বর থেকে মার্চ সময়টি সবচেয়ে উপযোগী। ঢাকা থেকে সরাসরি ধনবাড়ী বাস সার্ভিস রয়েছে, যা ২৫০-৩০০ টাকা ভাড়ায় চলাচল করে। ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে জমিদারবাড়িতে যেতে লাগে মাত্র তিন-চার মিনিট। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে এলে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি শুধু টাঙ্গাইল নয়, পুরো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পর্যটনের মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাই এটিকে যথাযথ সংরক্ষণ, প্রচারণা ও এটি নিয়ে আরও বেশি গবেষণা বাড়ানো গেলে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। সর্বোপরি, ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি শুধু একটি প্রাচীন প্রাসাদ নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গর্ব। রাজকীয় স্থাপত্য, নবাব পরিবারের কীর্তি, সমাজসেবার ইতিহাস ও
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি আমাদের অতীতের এক অমূল্য সম্পদ। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি আজও রাজকীয় ভঙ্গিতে স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিহাস কখনো মুছে যায় না; সে বেঁচে থাকে ইট, পাথর আর স্মৃতির নিঃশব্দ ভাষায়।
তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
