দুনিয়ার মোহ ও আখেরাতের বাস্তবতা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:৪০ এএম

মানুষের জীবনে দুনিয়া যতই আয়োজনমুখর হোক, শেষ পরিণতি এক অনিবার্য যাত্রার মধ্যেই নিহিত। জন্ম থেকে শুরু হওয়া পথচলা থেমে যায় মৃত্যুর দরজায় এসে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায়কে আমরা বলি পরকাল। মানুষ কত অর্জন, কত বেদনা, কত সাফল্য নিয়ে বাঁচে, কিন্তু একদিন সবকিছু ফুরিয়ে যায়। তখন যে জীবন সামনে উন্মোচিত হয়, সেটাই আসল জীবন। সেই জীবন শান্তিময় হবে নাকি ভীতিকর এ প্রশ্ন প্রতিটি মানুষকে ছুঁয়ে যায়। অথচ বেশিরভাগ সময় আমরা নিজেরাই তা ভুলে থাকি। দুনিয়ার মোহ, ব্যস্ততা, চাওয়া-পাওয়া ও সফলতার দৌড়ে পরকালের হিসাবকে গৌণ করে ফেলি। অথচ কোরআন ও হাদিস বারবার মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের সফলতা হলো পরকালে।

পরকাল বা আখেরাত বলতে মৃত্যু-পরবর্তী অন্তকালের জীবনকে বোঝায়। মানুষের মৃত্যু, কবর, কেয়ামত, হাশর, আমলের হিসাব-নিকাশ, জান্নাত-জাহান্নামের মতো সব বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে আখেরাত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের কৃতকর্ম ও কর্মফলের সঙ্গেও আখেরাত সম্পর্কিত। পরকালের পাথেয় অর্জন করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

প্রত্যেক মানুষ সুখ-শান্তি ও সফলতা চায়। কিন্তু সুখ-শান্তি ও সফলতা বলতে অনেকেই শুধু পার্থিব জীবনের আরাম-আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্যকেই বুঝে থাকে। এ জন্য দেখা যায়, পার্থিব দুনিয়া অর্জনের পেছনেই সব পরিশ্রম-প্রচেষ্টা। অথচ পরকালের জীবনই আসল ও চিরস্থায়ী জীবন। পরকালের সুখ-শান্তি ও সফলতাই হলো প্রকৃত সুখ-শান্তি ও সফলতা। বুদ্ধিমান তো তারাই যারা সেই অনন্ত-অসীম, চিরস্থায়ী জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে। তাদের কাছে পার্থিব দুনিয়া মূল্যহীন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এ দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। নিশ্চয়ই আখেরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত ৬৪)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘দুনিয়াকে যে প্রকৃত আবাস হিসেবে গ্রহণ করে, আখেরাতে তার নিরাপদ কোনো ঠাঁই থাকে না। অনুরূপ দুনিয়ার জন্য যে ধন সম্পদ সঞ্চয় করে, আখেরাতে তার সুখের কোনো অবলম্বন থাকে না। তা ছাড়া যে দুনিয়ার জন্য সঞ্চয় করে, সে কখনই জ্ঞানী বলে বিবেচিত হয় না।’ (কানজুল উম্মাল ৩/১৮৬)

হজরত ওসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ায় মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ৪টি। এক. থাকার মতো একটি ঘর। দুই. লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার মতো কাপড়। তিন. শুকনো কয়েক টুকরো রুটি। চার. পিপসা নিবারণের জন্য সামান্য পানি। এ ছাড়া যা কিছু রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বনি আদমের কোনো অধিকার নেই।’ (সুনানে তিরমিজি)

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘না, তোমরা প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার জীবনকে ভালোবাসো। আর পরকালকে উপেক্ষা করো।’ (সুরা কিয়ামাহ ২০-২১) বস্তুত মানুষ দুনিয়াকে এত বেশি ভালোবাসে ও গুরুত্ব দেয় যে, পরকালের জন্য কোনো কাজ করার সময় পায় না। তারা অনবরত দুনিয়া জমা করে চলেছে। অথচ এই দুনিয়া চিরকাল তাদের হাতে থাকবে না। একদিন এই সব ছেড়ে আখেরাতে পাড়ি জমাতে হবে। আখেরাত বাকি থাকবে। কিন্তু আফসোস, আখেরাত নিয়ে মানুষের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই।

আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার ব্যাপারে আমি যা জানি, যদি তোমরা তা জানতে, তাহলে বেশি কাঁদতে, কম হাসতে। সেই সঙ্গে দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করতে এবং আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে।’ (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব ৪/২৪৬)

হাসান বসরি (রহ.) বলেন, একবার সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি নির্মোহ এবং আখেরাতের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী, সেই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন ৩/৩২৫)

আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে, সে তার পরকালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর যে ব্যক্তি পরকালকে ভালোবাসে, সে তার দুনিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুতরাং তোমরা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পরিবর্তে চিরস্থায়ী পরকালকে প্রাধান্য দাও।’ (মুসনাদে আহমাদ)

হাসান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার মোহ সমস্ত পাপের মূল।’ (কানজুল উম্মাল ৩/১৯৪) মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য তার ফসলে প্রবৃদ্ধি দান করি। আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে তা থেকে কিছু দেই। আর পরকালে তার জন্য কোনো অংশই থাকবে না।’ (সুরা শুরা ২০)

প্রকৃত অর্থে দুনিয়া নিন্দিত বস্তু নয়। বরং প্রশংসা ও নিন্দা উভয়ই বান্দার কাজের প্রতি প্রযোজ্য। দুনিয়া হলো আখেরাতের সেতু এবং পারাপারের রাস্তা। দুনিয়া থেকেই জান্নাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে হয়। জান্নাতবাসীরা যে উত্তম জীবন লাভ করবে, তা মূলত দুনিয়ায় তাদের পুণ্যকর্ম ও উত্তম বীজ বপণ কার্যের বিনিময়েই অর্জিত হবে। অতএব দুনিয়া হলো নামাজ, রোজা ও দান-সদকা এবং কল্যাণমূলক কাজে প্রতিযোগিতার সঙ্গে ধাবিত হওয়ার স্থান।

মহান আল্লাহ আমাদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন মূল নিবাস জান্নাতের অধিকারী হয়ে তার কাছে ফিরে যেতে। দুনিয়াতে আমরা থাকতে আসিনি। এখানে আমরা অল্প সময়ের মুসাফির মাত্র। আমরা এখানে এসেছি আমাদের পরকালের যাত্রাকে নিরাপদ করতে। পরকালে শান্তিতে থাকার বন্দোবস্ত করতে। এখানে কয়েক দিনের সফরে আমরা যেন মহান আল্লাহর ইবাদত করতে পারি। নিজের ইমান-আমল পূর্ণ করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘সেদিন যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে, সেই প্রকৃত সফলকাম।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮৫) অর্থাৎ চূড়ান্ত সফল আমরা তখনই হতে পারব যখন তাকওয়া, ইখলাস ও ইবাদতের মাধ্যমে পাথেয় সংগ্রহ করে জান্নাত লাভ করতে পারব।

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, আখেরাতের প্রতি উপেক্ষাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বস্তুত মানুষ দুনিয়ার প্রতি এত বেশি আসক্ত এবং সেটাকে এত বেশি গুরুত্ব দেয় যে, পরকালের জন্য কোনো কাজ করার সময় পায় না, অবিরাম কেবল দুনিয়া জমা করে চলে। অথচ এই দুনিয়া কারও হাতে চিরকাল থাকবে না। একসময় সব ছেড়ে আখেরাতের পথে পাড়ি জমাতে হবে, যেখানে কেবল আমাদের সৎকর্মগুলোই বাকি থাকবে। মহান আল্লাহ আমাদের পরকালের পাথেয় অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত