মানিকগঞ্জে হাজারী গুড় তৈরিতে চলছে খেজুরের রস আহরণের প্রস্তুতি

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:১৭ পিএম

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে যখন একে একে জ্বলে উঠছে গুড়ের চুলা, তখনই শীতের আগমনী বার্তায় জেগে উঠছে একটি জেলার শতবর্ষী ঐতিহ্য। হাজারীর সিলমোহর ঠুকে বাজারে যখন প্রথম গুড় উঠবে তখন সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়বে দেশজুড়ে। অপেক্ষায় থাকবে মানুষ, এই শীতের প্রাকৃতিক মিষ্টিমুখের।

শীতের শুরুতেই মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা ও এর আশপাশের এলাকায় শুরু হয়েছে খেজুরের রস আহরণের ব্যস্ততা। ভোরের কুয়াশা, গাছির কুপ বসানোর টুংটাং শব্দ আর খেজুর রসের সোঁদা গন্ধ সব মিলিয়ে হেমন্তের শেষভাগেই জেগে উঠেছে জেলার শতবর্ষী গুড়শিল্প।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কেউ গাছ গোছাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ আগাম কেটে রস সংগ্রহও শুরু করে দিয়েছেন। গাছিদের মুখে এখন একটাই কথা “শীতই আমাদের নতুন বছরের শুরু, আর হাজারী গুড়ই আমাদের পরিচয়।”

মানিকগঞ্জের এই ঝিটকার হাজারী গুড় শুধু একটি পণ্য নয়, এটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ তিনশ বছরের ইতিহাস বহন করছে। ‘লোকসংগীত আর হাজারী গুড় মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসন এই গুড়কে ব্রান্ডিং করে। সেই থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারী গুড়ের পরিচিতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। শীত এলেই তাই মানুষ অপেক্ষা করে থাকে বিশুদ্ধ স্বাদ, অতুলনীয় ঘ্রাণ আর ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত এই গুড়ের জন্য। 

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নের শিকদারপাড়া গ্রামে মোহাম্মদ হাজারী নামের এক ব্যক্তি প্রায় তিনশ বছর আগে প্রথম বিশেষ পদ্ধতিতে এই গুড় তৈরি করেন। এর স্বাদ ও গন্ধের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের জন্য পরবর্তীতে ‘হাজারী গুড়’ নামেই এটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। গুড়ের স্বকীয়তা বজায় রাখতে ব্যবহৃত ‘হাজারী’ নামে একটি বিশেষ সিলমোহর আজও এর আসল পরিচয়ের প্রতীক।

বর্তমানে হাজারী পরিবারের উত্তরসূরিদের খুব অল্প সংখ্যক সদস্য নিজেরা গুড় তৈরি করলেও পরিবারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ২৭ জন নির্বাচিত গাছি সিলমোহর ব্যবহার করে বিশুদ্ধতা বজায় রেখে গুড় উৎপাদন করে যাচ্ছেন। তিনশ বছরের ঐতিহ্য যেন তাদের হাতেই টিকে আছে। ২০২৩ সালের শেষদিকে জেলা প্রশাসন শিকদারপাড়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হাজারী পল্লী’ ঘোষণা করে। পাশাপাশি খেজুর গাছের সংকট নিরসনে সরকারিভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ লাখ টাকার খেজুর চারাও রোপণ করা হয়। তবুও স্থানীয় গাছিরা মনে করেন, আগের তুলনায় খেজুর গাছের ঘাটতি বর্তমানে বেশ প্রকট।

সরেজমিনে গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় একাধিক খেজুর গাছ দেখা যেত। সেই গাছ থেকেই পরিবারের সদস্যরা রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতেন। এখন গাছ কমে গেছে, আর উৎপাদনও আগের মতো নেই। ফলে বাড়ছে উৎপাদন খরচ এবং বাজারমূল্য। ঝিটকার উজানপাড়া এলাকার অভিজ্ঞ গাছি করিম জানান, “আগে প্রতিটি বাড়িতে গাছ ছিল। রসও হতো প্রচুর। এখন গাছ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে বছর চুক্তিতে গাছ কিনতে হয়। এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। চারজন কামলা নিয়ে পুরো মৌসুম কাজ করতে হয়। সব খরচ যোগ করলে প্রতি কেজি লাল গুড় তৈরিতেই প্রায় ৬শত থেকে ১ হাজার টাকা পড়ে। আর হাজারী গুড় ১৮শ থেকে দুই হাজার টাকা না হলে আমাদের পোষায় না। তবু বাপ-দাদার পেশা বলে ধরে আছি। অনেকেই তো ছেড়ে দিয়েছে।”

একই এলাকার গাছি রমজান জানান, “যাদের বাড়িতে এখনো খেজুর গাছ আছে, তারা অনেকেই আর গুড় বানান না। আমরাই বিভিন্ন গাছ চুক্তি নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে কাজ করছি। গাছ কমে গেছে, মানুষ কমে গেছে, কিন্তু ঐতিহ্যটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি।” 

অন্যদিকে, হাজারী পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম নিজেরা গুড় তৈরি না করলেও তারা উদ্যোক্তা হিসেবে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করছেন। 

পরিবারের উত্তরসূরি শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম বলেন, “হাজারী গুড় আমাদের প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাস। গুণগত মান রক্ষা ও ঐতিহ্য অটুট রেখে আমরা নির্বাচিত গাছিদের দিয়ে গুড় তৈরি করাই। উৎপাদন কম হলেও চাহিদা অনেক। তাই আমরা যাচাই করে গাছি নির্বাচন করি এবং নিশ্চিত করি যে ভেজাল ছাড়া শুদ্ধ গুড় মানুষের হাতে পৌঁছায়। আমাদের প্রচেষ্টায় ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে।” তবে শীত এলেই বাজারে ভেজাল গুড়ের ছড়াছড়ি বাড়ে। এ অভিযোগ বহু বছরের। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার বলেন, “ভেজাল গুড় রোধে আমরা বরাবরই অভিযান পরিচালনা করে থাকি। এবছরও অভিযোগ পেলেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমাদের ফুড ইন্সপেক্টর আছেন। তিনি সব সময়ই বাজার মনিটরিংয়ে থাকবেন। এছাড়াও আমাদের অভিযানও চলমান থাকবে।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত