পাচারের অর্থ ফেরাতে মিলছে না সহায়তা

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৭ এএম

বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত দুর্নীতি বেড়েই চলছে। দুর্নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বছরে ১৩ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়ে থাকে। দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও ব্যাংকাররা এসব অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের সহায়তা পাচ্ছে না। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধিসহ দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদারে প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা হয়। এই দিনে বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে দুর্নীতি সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নৈতিকতা প্রচার করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশেও আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে দুদক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন ধরনের পোস্টার, ব্যানার প্রদর্শন, সংগীত পরিবেশন, জাতীয় ও দুদকের পতাকা উত্তোলন, বেলুন-ফেস্টুন ওড়ানো, গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন।

দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, ব্যাপক-উদ্দীপনার মাধ্যমে দিবসটি উদযাপনের লক্ষ্যে দুদক দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনা, জাতীয় পতাকা ও দুদক পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ৯টায় দুদক প্রধান কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও মানববন্ধন হবে। পরে সকাল ১০টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা অডিটোরিয়াম আলোচনা সভা হবে। সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মইদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৩ সাল থেকে সারা বিশে^ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়ানো। বছরে একটি দিন সভা বা বক্তব্য দিয়ে শেষ করাই এর কাজ নয়। যারা দুদকসহ অন্যান্য সংস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করেন, তাদের এ ক্ষেত্রে নিজেদের মূল্যায়ন করা দরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ কেন ফেরত আনা গেল না, তার হিসাব করা এবং এ ক্ষেত্রে কী করণীয়, তা ঠিক করা। দুদক ও অন্যান্য সংস্থায় যারা কাজ করেন, তাদের আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের যে শপথ, সেটি পালনে সচেষ্ট থাকা।

দুদকের তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছর ১৫ হাজার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে হাজারখানেক অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা হয়েছে। এ সময় ২ হাজার ২৯৭ জন আসামির বিরুদ্ধে ৫৪১টি মামলা এবং ১ হাজার ২০৩ জনের বিরুদ্ধে ৩৪৯টি চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। একই সময় দুদক সারা দেশে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিতে ২৩ গণশুনানি করেছে। একই সময় সারা দেশে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে ৮৬৪টি অভিযান পরিচালনা করেছে।

দুদকের তথ্যমতে, গত ৯ মাসে আদালতে ২৯৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১২৬টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের ৫ হাজার ৫৮ কোটি টাকা জরিমানা ও ৩২১ কোটি ৮৪ হাজার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তবে গত ৯ মাসে বিদেশে পাচার করা কোনো অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারেনি দুদক। বিদেশে পাচার করা অর্থ দুদক ফিরিয়ে আনতে প্রায় ৪০টি এমএলআর পাঠিয়েছে। সব এমএলআরের জবাব পায়নি সংস্থাটি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বিশে^র বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি পাচার হয়ে থাকে। গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে গড়ে বছরে প্রায় ৮ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার বা বর্তমান বিনিময় হারে ৯০ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে। এর বড় অংশ চলে গেছে বাণিজ্যভিত্তিক ভুয়া বা মিথ্যা ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে দাম কম বা বেশি দেখিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ পাচার কয়েক বছরে আরও বেড়েছে। এদিকে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে টিআইবি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ যায় ভুয়া আমদানি-রপ্তানি বিলিং, শেল কোম্পানি ও অফশোর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে, হুন্ডি ও অবৈধ রেমিট্যান্স চ্যানেল, নামমাত্র বিনিয়োগ দেখিয়ে বিদেশে সম্পদ কেনার মাধ্যমে।

সরকারি সূত্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ সবচেয়ে বেশি গিয়েছে যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড ও ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, কেম্যান আইল্যান্ডস ও বাহামা দ্বীপে শেল কোম্পানিতে।

দুদকের তথ্য বলছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা বিশ্বের সব দেশের জন্যই সবচেয়ে কঠিন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে থাকে। এগুলো হলো বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুদক ও এনবিআর পাচারকারীদের ব্যাংক হিসাব ও বিদেশি সম্পদের সম্পদ অনুসন্ধান, আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) বা পারস্পরিক আইনি সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংক রেকর্ড ও দলিল সংগ্রহ করা হয়। তার যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, বিদেশি আদালতে মামলা করে সম্পদ ফ্রিজ ও বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা করা হয় এবং বাজেয়াপ্ত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের অনুকূলে ফেরত পাঠানো হয় এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলে যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে এখনো বড় অঙ্কের সফল উদ্ধারের নজির নেই। তবে সরকারি সংস্থাগুলো জানিয়েছে, কয়েকটি হাইপ্রোফাইল মামলায় বিদেশে থাকা সম্পত্তির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আইনগত লড়াই চলছে।

দুদকের শীর্ষপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস শুধুই অভিযোগ বা পরিসংখ্যান প্রকাশের দিন নয়। এটি মানুষকে সততা, নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা রক্ষার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। দুর্নীতি রোধ এবং অবৈধ অর্থের দেশে ফেরত আনা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নতি সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে যে অর্থ গেছে, সেগুলো ফেরত আনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা সীমিত। এগুলো আরও শক্তিশালী করা দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত