অচেনা সাজিদের জন্য অগণিত মানুষের কান্না

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:১৮ এএম

গভীর গর্তে পড়ে নিহত তানোরের দুই বছরের শিশু সাজিদ হোসেনকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে। অগণিত মানুষের ভালোবাসা নিয়ে চিরবিদায় নেওয়া এই ছোট্ট শিশুকে বিদায় জানাতে অসংখ্য মানুষ হাজির হয়েছিল তানোরের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের মাঠে। গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে বাড়ির পাশের মাঠে জানাজা হয়। পরে পাশেরই স্থানীয় কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

দুদিন আগেও ছোট্ট সাজিদকে কে বা চিনত? কিন্তু বুধবার দুপুরে গভীর গর্তে পড়ে যাওয়ার পর থেকে তানোরের অজোপাড়া গ্রাম হিসেবে পরিচিত কোয়েলহাটের সেই সাজিদের নাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব জুড়ে। প্রতিটি মানুষের হৃদয়কোণে জায়গা করে নেয় অবুঝ এই শিশু। গর্ত থেকে জীবিত উদ্ধার হোক এমন প্রার্থনা করেছেন দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষ। ৩২ ঘণ্টা প্রচেষ্টার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা যখন তার নিথর দেহ উদ্ধার করেন, তখনো কোথাও যেন একটা আশা দেখছিলেন দুদিনেই সাজিদকে যারা ভালোবেসে ফেলেছিলেন। কিন্তু সাজিদ অনেক আগেই মারা গেছে চিকিৎসকের এমন ঘোষণার পর নিভে যায় সব আশার আলো। দুদিন ধরে গর্তের পাশে উদ্ধারকাজে সবার নজর থাকলেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে তানোরসহ আশপাশের উপজেলার মানুষের ঢল নামে সাজিদের বাড়ির রাস্তায়। স্বজন, প্রতিবেশীদের পাশাপাশি অচেনা বহু মানুষও কেঁদেছেন সাজিদের কষ্টে।

কোয়েলহাট গ্রামের মানুষের কাছে অন্য দিনের থেকে গতকাল শুক্রবারের সকালটা ছিল আলাদা। শেষ বিদায় জানাতেও অগণিত মানুষ হাজির হয়েছিল কোয়েলহাটের খোলা মাঠে। একসঙ্গে এত মানুষ কখনো দেখেনি এই গ্রাম বা আশপাশের মানুষ। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে সাজিদের জানাজার সময় জানিয়ে। সকাল থেকেই গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ ভ্যানে চড়ে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ ভুটভুটিতে করে আসছেন। সবার পথের শেষ সাজিদের বাড়ির সামনে। ছোট্ট শিশুর নিষ্পাপ মুখটা শেষবারের মতো দেখতে খাটিয়ার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সব বয়সের মানুষ। বাড়ির পাশে শতশত নারী দাঁড়িয়ে শিশুর খাটিয়া ঘিরে। সবাই শোকাহত। মর্মাহত। আবেগঘন এক পরিবেশ পুরো গ্রাম জুড়ে। জানাজার মাঠে অসংখ্য মানুষের ঢল নামে সকালেই। গ্রামের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে স্কুলপড়–য়া ছেলেরা সবার মুখে কষ্টের ছায়া। শুধু গ্রামের মানুষ নন, তানোর এমনকি বাইরের বিভিন্ন উপজেলার মানুষও হাজির হয়েছিলেন দাফনে অংশ নিতে। এখানে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন তাদের বেশিরভাগই কখনো দেখেনি সাজিদকে। কিন্তু কষ্টে যেন সবারই বুকের ভেতরে মোচড় দিচ্ছে। জানাজায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষকেই সাজিদের জন্য কাঁদতে দেখা গেছে।

জানাজার নামাজের ইমামতি করেন কাজী মাওলানা মিজানুর রহমান। জানাজা শুরুর আগে সাজিদের বাবা রাকিবুল ইসলাম সবার কাছে ছেলের জন্য দোয়া চান। স্থানীয় গণ্যমান্য কয়েকজন ব্যক্তিও কথা বলেন সেখানে। দোয়া চান সাজিদের জন্য। তার পরিবারের জন্য। জানাজা শেষে সাজিদের মরদেহ যখন কবরের দিকে নেওয়া হলো, তখন শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ। কান্না করছেন স্বজনরা। পাড়া-প্রতিবেশীরা। চেনা-অচেনা অনেকেই।

মায়ের আহাজারি থামছেই না :

প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে ডু করে কাঁদছেন বাবা-মা। মা রুনা খাতুন বারবার কাঁদছেন আর বলছেন, আমি নিজের হাতে ছেলেকে মেরে ফেলেছি। কোল থেকে না নামালে হয়তো গর্তে পড়ত না বলে বারবার কাঁদছেন রুনা।

গতকাল রুনা জানান, সাজিদ বয়স অনুযায়ী অনেক বেশি কথা বলত। ওর বয়সের অন্য বাচ্চাদের তুলনায় ও বেশি কথা বলত। খুবই চটপটে ছিল। ও গাড়ি দেখতে পছন্দ করত। বুধবার দুপুরে বাড়ির পাশে মাঠে একটি পাওয়ার ট্রলি কাদায় আটকে গিয়েছিল। ছেলে যেহেতু গাড়ি পছন্দ করত, সেকারণেই তাকে গাড়ি দেখানোর জন্য কোলে নিয়ে বের হন। এক কোলে সাজিদকে আরেক কোলে ছোট আরেক বাচ্চাকে নিয়ে মাঠে যান রুনা খাতুন। মাঠে যাওয়ার পর হাতে ব্যথা হচ্ছে বলে তিনি সাজিদকে কোল থেকে নামতে বলেন। আপত্তি না করে সাজিদ কোল থেকে নেমে যায়। মায়ের পেছন পেছনই হাঁটছিল সে। রুনা গর্ত পার হয়ে গেলেও গর্তে পড়ে যায় সাজিদ। গর্তের মুখে খড়কুটো পড়ে থাকায় বুঝতে পারেননি এখানে গর্ত আছে। এরপরই ‘আম্মা’ বলে চিৎকার করে সাজিদ। পেছনে ফিরে রুনা দেখেন সাজিদ নেই। আরেকটু সামনে এগোতে থাকলে গর্তের ভেতর থেকে বাচ্চার শব্দ শুনতে পান। এরপরই চেঁচামেচি শুরু করেন রুনা। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে উদ্ধারের চেষ্টা করে। পরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়।

সাজিদের বাবা রাকিবুল হাসান বলেন, আমি ফুটফুটে একটা সন্তান হারিয়েছি। আমার একটা কলিজা হারিয়ে ফেলেছি। গোটা পৃথিবী থাকলেও আমি আর এটা পাব না।

তিনি বলেন, এখন আমার কিছু করণীয় নেই। এখন শুধু দোয়া করতে হবে। যেহেতু আল্লাহই দিয়েছেন, আল্লাহর জিনিস আল্লাহ নিয়ে গেছেন। ছেলের মৃত্যুর জন্য গর্ত খননকারী ব্যক্তির অবহেলাকে দায়ী করে তিনি বলেন, গর্তের মুখে তারা যদি কিছু দিত, তারা যদি একটা নিশানা দিত তাহলে এ রকম ঘটনা ঘটত না। তারা কিছুই দেয়নি।

এদিকে, স্বজন ও স্থানীয়দের পাশাপাশি সাজিদের পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনও। গতকাল দুপুরে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান সাজিদের বাড়িতে যান। তার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেন। এ সময় তিনি কিছু শুকনো খাবারও তুলে দেন। সাজিদের পরিবারকে তিনি সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা দেন। সেই সঙ্গে সাজিদের পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি জানান, এই ঘটনা নিয়ে সাজিদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে সাজিদকে উদ্ধার করা হয় মাটির ৫০ ফুট গভীর থেকে। সেখান থেকে উদ্ধারের পর দ্রুত তাকে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর রাত ১০টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি জানান, সরু গর্তে পড়ে শিশু সাজিদ যত নড়াচড়া করেছে, ততই নিচের দিকে নেমে গেছে। আবেগতাড়িতভাবে স্থানীয়রা উদ্ধারের চেষ্টা করার সময় মাটি ও খড় পড়ে যায় শিশুটির ওপর। এতে তার জীবিত থাকার সম্ভাবনা কমে যায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা সাজিদকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করি। নিথর দেহটা হাতে পাওয়ার পর আমরা নিজেরাও কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। তবুও দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করেছি। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।’

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গর্তে পড়ে যাওয়ার পর সাজিদ যত নড়াচড়া করেছে, ততই আরও নিচে নেমে গেছে এমন দুর্ঘটনায় স্বাভাবিক একটি বিষয়। ওপরে সামান্য চাপ পড়লেও ৩০, ৪০ বা ৫০ ফুট নিচে তা অনেক ভারী হয়ে যায়। এমনকি একটি ছোট ইটের টুকরোও সেখানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। কারণ এত গভীরে অক্সিজেন খুব কম থাকে। সামান্য নড়াচড়াতেই শিশুটি আরও তলিয়ে গেছে এটাই বাস্তবতা, এটাই তার কপালে ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত