শখের ফটোগ্রাফার মাদ্রাসাশিক্ষক মিসবাহ

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২০ এএম

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার করাব ইউনিয়নের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়েছেন মাদ্রাসাশিক্ষক মিসবাহ উদ্দিন নাঈম। বাবা-মা, দাদি, দুই বোন ও ছোট ভাইকে নিয়ে তিনি পরিবারের বড় ছেলে। পরিবারের কেউই ছবি তোলা পছন্দ করেন না, বিশেষ করে বাবা। তবুও নাঈমের হৃদয়ের ভেতরে অন্যরকম এক টান ছিল, চোখে যা ভালো লাগে, সেটি ধরে রাখতে চাওয়ার সহজ অথচ গভীর অনুভূতি। সেই অনুভূতিই একসময় তাকে ফটোগ্রাফির পথে হাঁটতে শেখায়।

দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পর বর্তমানে তিনি নিজ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষকতার নিয়মিত ব্যস্ততা, সামাজিক রক্ষণশীলতা ও পরিবেশের সীমাবদ্ধতাসহ সবকিছুর মাঝেও ফটোগ্রাফির জন্য সময় বের করা সহজ নয়। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। তার ভাষায়, ‘ভালো লাগা থেকেই ছবি তুলি, এটাকে পেশা বললে ভুল হবে।’

ফটোগ্রাফির সূচনাটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। করোনোর সময় ছাত্রাবস্থায় অনেক কষ্টে কিছু টাকা জমিয়ে একটি সিম্ফনি স্মার্টফোন কিনেন। তখন থেকেই চোখে যা ভালো লাগত তাই ক্যামেরাবন্দির চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেই ফোনটি মাত্র ছয় মাসের মাথায় পানিতে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর খুব কম দামে আরেকটি ফোন কেনেন, কিন্তু মানসম্মত ছবি আসত না। তবুও হাল ছাড়েননি। শিক্ষকতার প্রথম মাসে পুরনো ফোন নষ্ট হয়ে গেলে ধারদেনা করে আরেকটি স্মার্টফোন কেনেন। সেই ফোনই তাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। প্রথমদিকে সমালোচানার ভয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করতে সংকোচ বোধ করতেন। পরে একজন শুভাকাক্সক্ষী কিছু ছবি দেখে তাকে আপলোড করতে উৎসাহ দেন। সেখান থেকেই তার নিয়মিত যাত্রা শুরু।

প্রায় দুই বছরের বেশি সময় স্মার্টফোন দিয়ে ছবি তোলার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিজের উপার্জন থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে তিনি পিক্সেল সেভেন কেনেন। এখন এটিই তার সঙ্গী। স্ট্রিট, পোর্ট্রটে, ল্যান্ডস্কেপ থেকে শুরু করে ম্যাক্রোসহ সব ধরনের ছবি ধারণে তিনি আনন্দ খুঁজে পান। ক্যামেরা ও ড্রোন কেনার স্বপ্ন তার মনে গেঁথে আছে। তিনি বলেন, ‘একদিন আমারও ক্যামেরা হবে ইনশাআল্লাহ। পাখির চোখে দেখে ক্যামেরায় ধরব এই বাংলার রূপ।’

তার ছবিতে প্রকৃতি, গ্রাম, মানুষের সাধারণ জীবনসহ সবকিছুই ধরা পড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তবে এই পথ একেবারেই সহজ ছিল না। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করতে গেলে মানুষ নানা সমালোচনা করেছে। তা তাকে থামাতে পারেনি। নিজের জগৎ ও নিজের স্বপ্নই তার পথচলার শক্তি।

ফটোগ্রাফি শেখার ক্ষেত্রে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। সিনিয়র ফটোগ্রাফারদের ছবি দেখে শেখেন। ছবি কারেকশন, ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো একজন গাইডের অভাব তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেন। তবুও শেখা থেমে নেই, শখের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি কাজে লাগান। ভবিষ্যতে কোনো দিন নিজের ছবি এক্সিবিশন করার ইচ্ছে আছে।

আশপাশের মানুষ তার কাজের ব্যাপারে নানা কথা বলেন। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেন এবং সেই স্বপ্নই তাকে ক্রমে ক্রমে সামনে এগিয়ে দেয়। তার ভাষায়, ‘মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখতেও মানা, তবুও দেখি। আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।’

ফটোগ্রাফি তার কাছে শুধু ছবি তোলা নয়, এটি নিজের ভালো লাগা, নিজের অনুভূতির প্রকাশ। ব্যস্ততার মাঝেও তিনি চান এই শখ যেন আজীবন বেঁচে থাকে। একদিন ভালো কিছু সৃষ্টি করার স্বপ্ন তিনি নিয়ে এগিয়ে যেতে চান নিজের মতো করে ধীরে, দৃঢ়ভাবে, নীরবে।

লেখক : গবেষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত