মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মহান রাব্বুল আলামিন মানুষকে নিছক রক্ত-মাংসের অবয়ব হিসেবে সৃষ্টি করেননি, তাকে দান করেছেন চিন্তাশক্তির এক বিশাল সম্ভার। পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রহমানের শুরুতে মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দান করার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন। এই মেধা ও প্রতিভা হলো স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক অপূর্ব নেয়ামত, যা মানুষকে পশুপাখি থেকে আলাদা করেছে। চিন্তাশীল মানুষের জন্য এই মহাবিশ্বের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে স্রষ্টার নিদর্শন। আল্লাহ প্রদত্ত এই মেধা ও মননকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই হলো একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব।
মেধা ও প্রতিভা বিরাট এক শক্তি। সব মানুষের মধ্যে মেধা ও প্রতিভার উপস্থিতি রয়েছে। তবে কেউ এটা কাজে লাগাতে পারে, আবার কেউ অযতেœ-অবহেলায় তা নষ্ট করে দেয়। মহান আল্লাহ মানুষের মধ্যে এই অমূল্য সম্পদ নিহিত রেখেছেন এটা কাজে লাগিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে চেনার জন্য। সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করার জন্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ জ্ঞানীদের দুনিয়ার গতিবিধি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলেছেন। আর এর জন্য মেধা ও প্রতিভার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসুলরা মহান আল্লাহ প্রদত্ত মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়েই যুগের সেরা মানুষ হয়েছেন।
প্রতিভা মহান আল্লাহর একটি বিশেষ ও অপূর্ব নেয়ামত। মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগানোই হচ্ছে এর সার্থকতা। মহান আল্লাহর সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন করা, তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া জ্ঞানীদেরই কাজ। জ্ঞানীরা যদি তাদের অমূল্য সম্পদ মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারেন, তবে তারাই সফল।
পক্ষান্তরে জ্ঞানীরা যদি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হন, তবে এর মাশুলও তাদেরই গুনতে হবে। একজন গণ্ডমূর্খ ও নির্বোধ লোক মহান আল্লাহর পরিচয় লাভে ব্যর্থ হলে সে যতটুকু দায়ী হবেন তার চেয়ে শতগুণ বেশি দায়ী হবেন একজন মেধাবী ও প্রতিভাধর ব্যক্তি।
মেধা ও প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন না হলে মহান আল্লাহ তা ছিনিয়ে নেন। এর দ্বারা অসদাচরণ করলে মেধা ও প্রতিভার অবক্ষয় হয়। মেধা ও প্রতিভা সব মানুষের মধ্যেই কম-বেশি আছে। এটা স্রষ্টার প্রকৃতিগত দান, কারও অর্জিত নয়। এ জন্য সবার উচিত মেধা ও প্রতিভাকে প্রকৃত অর্থে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কল্যাণ ও সাফল্য অর্জন করা।
মানবতার কল্যাণে, সৃষ্টির উন্নয়নে কিছু করতে পারাই প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন। অমূল্য এই সম্পদটুকু যেন সৃষ্টি ও মানবতার বিরুদ্ধে ব্যয় না হয়, সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ভালো কিছু না পারলেও অন্তত মন্দ কিছু যেন মস্তিষ্ক থেকে বের না হয়, সে প্রতিজ্ঞা করতে হবে সবাইকে। মেধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে। মেধার অপব্যবহার যেমন ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ ধ্বংস, তেমনি এর সঠিক ব্যবহার পৃথিবীকে করে তুলতে পারে শান্তিময় ও সুন্দর। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেয়ামতের দিন এই নেয়ামতের হিসাব দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন জ্ঞান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, যা কোনো উপকারে আসে না। (সহিহ মুসলিম)
তাই আমাদের উচিত, অলসতা ও অবহেলায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে নিজস্ব মেধার বিকাশ ঘটানো। ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মেধার সঠিক ব্যবহার করে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও প্রবন্ধকার
