আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন পক্ষে এ অভিযোগ দাখিল করা হয়। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে ২১ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ আরও বেশ কয়েকজনকে গুমের ঘটনায় এ আসামির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং এ বিষয়ে পৃথক তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে ইলিয়াস আলীকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘমেয়াদে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ জিয়াউল আহসান টেলিযোগাযোগ নজরদারি জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তখন তিনি মেজর জেনারেল (পরে বরখাস্ত)। গত বছর আওয়ামী লীগের পতনের পর ৬ আগস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর ১৬ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে ২০০৯ সালে মেজর পদে থাকাকালে তিনি র্যাব-২-এর উপঅধিনায়ক হন। একই বছর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তাকে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (তখন তিনি কর্নেল পদে) করে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১৬ সালে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গতকাল তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ দাখিল করা হয়। এর মধ্যে ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে সজল নামে একজনসহ ৩ জনকে গুলি করে হত্যা, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বরগুনার বলেশ^র নদীর মোহনায় ৫০ জন ব্যক্তিকে গুলি করে ও লাশ গুম করা এবং ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার বলেশ^র নদী সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে বনদস্যু দমনের নামে ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকালে ঢাকার শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীতে ২০১০- ২০১৩ সালে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ পদ্ধতিতে কমপক্ষে ২০০ জনকে হত্যায় জিয়াউল আহসানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২০১০ সালে বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একই বছর ছাত্রশিবির নেতা গোলাম মর্তূজা মিহিনসহ তিনজনকে গুম করার অভিযোগ রয়েছে জিয়াউলের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলীকে গুম করা, ২০১৩ সালে ছাত্রশিবিরের আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেনকে গুম ও হত্যা, একই বছরের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার নামে ৬১ জনকে হত্যার ঘটনায় জিয়াউল আহসানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
প্রসিকিউশন থেকে আরও জানানো হয়, ২০১৩ সালে বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ আরও ৭ জনকে গুম, ২০১৫ সালে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় এনটিএমসি কর্র্তৃক ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে অপহরণ, নির্যাতন, গুম ও হত্যার মাধ্যমে লাশ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের আসামি জিয়াউল আহসানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে পৃথক তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
২০১২ সালে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীকে গুম ও হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইলিয়াস আলীকে উঠিয়ে নেওয়া, রাস্তা থেকে তাকে গুম করা এবং তাকে পরবর্তীকালে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে।’
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, বনদস্যু দমনের নামে জিয়াউল আহসানের মানুষদের গুম করে হত্যা করতেন। পরে লাশের পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বা বস্তার সঙ্গে বেঁধে বলেশ^র নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া হতো। এ ছাড়া গুম ও হত্যার পর কখনো শীতলক্ষ্যা, কখনো বুড়িগঙ্গায় লাশ ফেলা হতো। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “গুমের ‘অসাধারণ দক্ষতার’ কারণে তদানীন্তন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা পুরস্কৃত করতে নিয়মবহির্ভূতভাবে জিয়াউল আহসানকে একে একে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ও তার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নির্দেশে এসব গুমের ঘটনা ঘটিয়েছেন আসামি জিয়াউল আহসান।”
