ঋণ করে রিজার্ভ বাড়ানো ঠিক নয়

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৪৮ এএম

বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নিয়ে রিজার্ভ বাড়ানো ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তারমতে, রিজার্ভ বাড়াতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের থেকে ধার নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজস্ব উৎস থেকেই রিজার্ভ বাড়াতে হবে। চলতি অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তার।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্ম : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ও মিচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

গভর্নর বলেন, ‘আমাদের রিজার্ভ গত বছর আট বিলিয়নের উপর বেড়েছে। এ বছর অলরেডি দেড় বিলিয়ন, দুই বিলিয়ন এর মতো বেড়ে গেছে। আমাদের ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট নিয়ে আমাদের কোনো শঙ্কার কারণ নেই। ভেবেছিলাম দু-তিন বছর লাগবে। সেটা আমরা প্রথম বছরেই অর্জন করে ফেলেছি। অমরা প্রায় আড়াই বিলিয়নের ওপর ডলার কিনেছি বাজার থেকে। আরও কিনব যখনই দরকার হবে। আমাদের পলিসি হচ্ছে যে আমাদের রিজার্ভ আমাদেরই বাড়াতে হবে। ধার করে আইএমএফ থেকে অর্থ নিয়ে বা বিশ্বব্যাংকের অর্থ নিয়ে আমাদের রিজার্ভ বাড়ানো সম্ভব নয়। এটি উচিতও নয়।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের এনপিএল (খেলাপি ঋণ) হয়তো পৃথিবীর সর্বোচ্চ তালিকার মধ্যে। ডিসেম্বরের মধ্যে মন্দ ঋণ কিছুট কমে যাবে। সর্বশেষ মন্দ ঋণ ৩৬ শতাংশ হয়েছে, অনেকেই এই তথ্য প্রকাশ করতে মানা করেছিলেন। কিন্তু আমরা প্রকাশ করেছি। আমরা ভুল বা মিথ্য তথ্য দিতে প্রস্তুত নই। আমরা প্রকৃতপক্ষে যে অবস্থায় আছি সেই তথ্য প্রকাশ করব এবং সেখান থেকেই উত্তরণ ঘটাবো।

এ সময় তিনি বলেন, ২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ নতুন করে যাচাই করা হবে। এসব ঋণের জামানত ঠিক আছে কি না, তা দেখা হবে। না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি করতে হবে।

কোনো ব্যাংকের অবস্থা ভালো থাকলে সেখানে হস্তক্ষেপ করা হবে না জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংক যদি ভালো না হয়, আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করব। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে। আমি মনে করি এই ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে। এখানে সরকারের কোনো ক্ষতি হবে না।’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনীতির সব সূচকই দুর্বল অবস্থায় ছিল। অনেকগুলো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সংস্কারগুলো দৃশ্যমান হয়েছে আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে। সংস্কারের ফল পুরোটা দেখা যায়নি, এর জন্য সময় প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি মন্দ ঋণ ১১ থেকে ১২ শতাংশ ছিল। মন্দ ঋণ এখনো ৩৬ শতাংশ। যা আমাদের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে দেশের ব্যাংকিং খাত একটি জঞ্জাল পূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। এটা কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরে এই অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্থনীতিটা পেয়েছে, সেখানে তো আমরা দেখেছি যে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই কিন্তু একটা দুর্বল অবস্থানে ছিল। বেশ দুর্বল অবস্থানে ছিল। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত অন্যতম একটা দুর্বলতম জায়গায় ছিল। সেখান থেকে অনেক ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন একটি সন্ধিক্ষণ। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংকিং খাতকে কীভাবে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের মাধ্যমে ব্যাংক খাত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এ জন্য এখন খেলাপি ঋণ ৩৬ শতাংশ পৌঁছে গেছে। এখন যে সংস্কার হচ্ছে, তা রাজনৈতিক সরকার কতটা এগিয়ে নেবে তা গুরুত্বপূর্ণ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত