ওসমান হাদির মৃত্যুপরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পত্রিকা অফিসে হামলার নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের পর বাংলাদেশ এখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনার এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনের শাসন রক্ষায় ব্যর্থতা নাগরিক পরিসরকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে এবং আরও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আর এই ঝুঁকির তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানাচ্ছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, ১৯ ডিসেম্বর দুর্বৃত্তরা প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা চালায়। এসব সহিংসতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশটি দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে। পৃথক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড একটি ভয়াবহ ঘটনা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত আগস্ট থেকে দেশে যে মব সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা ঠেকাতে বাংলাদেশ কর্র্তৃপক্ষকে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ফেব্রুয়ারিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ভয়ংকর আঘাত। তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় কিছু রাজনৈতিক পক্ষের উসকানিতে সহিংসতায় এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মী, এমনকি শিল্পী ও গায়ক-গায়িকাদেরও ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করে বলেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা ও চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের নাগরিক পরিসরকে সংকুচিত করছে এবং নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের সহিংসতায় অ্যামনেস্টির উদ্বেগ : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু, এর প্রতিক্রিয়ায় দলবদ্ধ সহিংসতা এবং সনাতন ধর্মের একজনকে নির্মমভাবে হত্যার পৃথক এক ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। লন্ডনভিত্তিক সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের অফিশিয়াল পেজ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গতকাল শনিবার পোস্টের মাধ্যমে এই বিবৃতি দেওয়া হয়।
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-১ আসনের প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে সহিংস হয়ে ওঠে জনতা। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে হাদিকে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সংঘটিত আন্দোলনের সময় হাদি আলোচনায় আসেন যে আন্দোলনের মাধ্যমে সে বছরই আগের ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাচ্যুত হন। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর একদল উন্মত্ত জনতা ‘প্রথম আলো’ ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ভবনগুলোতে আগুন দেয়, লুটপাট ও ভাঙচুর করে। এই সহিংসতা গত শুক্রবার ভোর পর্যন্ত চলে। এ ছাড়া দেশের প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচীর ওপরও হামলা হয়। শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় নিউ এইজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবীরকে। এসব ঘটনার দ্রুত, পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
এ ছাড়া একই দিনে ময়মনসিংহে ভিন্ন এক ঘটনায় সনাতন সম্প্রদায়ের পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে একদল ব্যক্তি। পরে তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায় তাদের। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওই ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এসব সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এসব ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। সহিংসতায় জড়িত সবাইকে অবিলম্বে ন্যায়বিচারের আওতায় আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
