ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির খুনিদের এই বাংলার জমিনে প্রকাশ্যে বিচার দেখার আকুতি জানিয়েছেন তার বড় ভাই ড. মাওলানা আবু বকর ছিদ্দিকি। এ সময় জানাজায় আগত লাখো জনতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবু বকর ছিদ্দিকি প্রশ্ন রাখেন, খুনিরা দিনদুপুরে খুন করে কীভাবে সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে গেল?
গতকাল শনিবার দুপুরে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজা অনুিষ্ঠত হওয়ার আগে লাখো জনতার সামনে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার ইমাম আবু বকর ছিদ্দিক ছোট ভাই হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, সাত আট দিন হয়ে গেল, খুনি দিনদুপুরে গুলি করে যদি পার পেয়ে যায় এর চেয়ে লজ্জার কিছু নেই। যদি সীমান্ত পার হয়ে যায়, পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টার মধ্যে তারা কেমন করে গেল? এই প্রশ্ন জাতির কাছে রেখে গেলাম। আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমার ভাই শহীদ হয়েছে, তার শহীদী তামান্না ছিল। হয়তো আল্লাহ তার শহীদী মৃত্যু নসিব করেছেন।
তিনি বলেন, কিন্তু আপনাদের কাছে আমি এই ঋণ কখনো ছাড়ব না, আমার ভাই শরিফ ওসমান হাদির বিচার যেন প্রকাশ্যে এই বাংলার জমিনে দেখতে পারি। সাত আট দিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম না। এই দুঃখে কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
ড. আবু বকর বলেন, আমার কলিজার টুকরা ছোট ভাই শহীদ শরিফ উসমান হাদি স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি মেসেজ দিয়েছিলেন কীভাবে এটি রক্ষা করতে হয়।
তিনি বলেন, আমার মা প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছেন, জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট শরিফ ওসমান হাদি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তৌহিদের দ্বীপ বাংলাদেশকে যেন রক্ষা করতে পারি।
ওসমান হাদির রেখে যাওয়া আট মাসের শিশুসন্তানের কথা স্মরণ করে তার বড় ভাই বলেন, ‘এই আট মাসের সন্তানকে তিনি রেখে গেছেন। সন্তানের নামকরণের আগে ওসমান হাদি আমাকে যা বলেছিলেন, সেই স্মৃতি আজ বারবার মনে পড়ছে।’
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘খুনি, পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারীসহ পুরো চক্রকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সচিবকে পদত্যাগ করতে হবে।’
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হাদির হত্যাকারী গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদিকে ১৬৮ ঘণ্টা আগে গুলি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে?’ আমরা মনে করছি, খুনি একজন নয়, পুরো একটা খুনি চক্র কাজ করেছে। খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারী, পুরো খুনি চক্রকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
জাবের বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা (জাহাঙ্গীর আলম) ও সহকারী উপদেষ্টাকে (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদাবক্স চৌধুরী) জনসম্মুখে এসে জানাতে হবে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন। যদি না পারেন, তাদের পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা ওসমান হাদির রক্তকে বৃথা যেতে দেব না। ওসমান হাদির রক্তের মাধ্যমে এ দেশে ইনসাফ কায়েম হবে। নয়তো আমরা রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’
তবে কোনো ধরনের সহিংসতার উসকানিতে সাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাবের বলেন, ইনকিলাব মঞ্চ থেকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান। ওসমান হাদির মরদেহ গতকাল শুক্রবার সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনা হয়। রাখা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মর্গে। এরপর দুপুর ২টায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে হাদিকে দাফন করা হয়েছে। শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে গতকাল রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
