সোনার দাম বাড়ছেই। নতুন বছর মূল্যবান ধাতব পণ্যটির দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে খাতসংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থা। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি সাড়ে ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে গত ২৬ ডিসেম্বর। কিটকোর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার নিউ ইয়র্ক সময় সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এই দাম ছিল ৪ হাজার ৫৩৩ ডলার। যেখানে মূল্যবান এই কমোডিটির দাম গত সপ্তাহেই ৪ হাজার ৪০০ ডলার ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়েছে।
জানা গেছে, পুরনো বছরের সোনার দাম বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা আগামী বছরেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। যার তথ্য আভাস পাওয়া যায় গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে। গোল্ডম্যান স্যাকসের ২০২৬ সালের এক আউটলুকে বলা হয়েছে, ‘আগামী বছর পুরো কমোডিটি খাতের মধ্যে সোনা হবে সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ। যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো বৈচিত্র্যকরণে যোগ দেয়, তাহলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সময় অনুযায়ী গত সোমবারই সোনার দামে আন্তর্জাতিক বাজারে রেকর্ড হয়। সেদিনই প্রথম আউন্সপ্রতি দাম প্রথম ৪ হাজার ৪০০ ডলার ছাড়িয়ে ৪ হাজার ৪৮৬ ডলারে স্থির হয়েছিল। রেকর্ড গড়ার দিনই অবশ্য এই দাম সাড়ে ৪ হাজার ছাড়ানো শুধু সময়ের ব্যাপার বলে জানিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা সোনায় বিনিয়োগের কারণগুলোর মধ্যে বড় একটি। কারণ ২০২৫ সালে কমোডিটি সূচকগুলোর মধ্যে শক্তিশালী রিটার্ন এসেছে মূল্যবান ধাতু থেকে, যা সুদহার বা বন্ডের লাভকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছরে যদি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার আরও কমায় তাহলে সোনায় বিনিয়োগ এমনিতেই বেড়ে যাবে।
এদিকে গোল্ডম্যান স্যাকস সবচেয়ে বেশি আশাবাদী সোনার বিষয়ে এবং এর পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদা বড় ভূমিকা রাখছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। প্রতি মাসে গড়ে ৭০ টন করে সোনা কিনবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। যেখানে এ বছর গড়ে ৬৬ টন করে সোনা কেনা হয়েছে, যা ২০২২ সালের মাসিক গড় ১৭ টনের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘প্রথমত ২০২২ সালে রাশিয়ার রিজার্ভ জব্দ করা উদীয়মান বাজারগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। দ্বিতীয়ত, চীনের মতো উদীয়মান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা রিজার্ভের অংশ এখনো বৈশ্বিক সহকর্মীদের তুলনায় কম, বিশেষ করে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চীনের উচ্চাকাক্সক্ষার প্রেক্ষাপটে। অর্থাৎ চীন আরও বেশি সোনা কিনতে আগ্রহী। তৃতীয়ত, জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনার প্রতি আগ্রহ এখন রেকর্ড উচ্চতায়।’
বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, সোনার দামের পূর্বাভাসে ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকি রয়েছে, যদি এই বৈচিত্র্যকরণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়িয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আরও বিস্তৃত হয়। এই প্রবণতা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বর্ণের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে এবং বহু বছরের শেয়ার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সোনার দাম খানিকটা কমে আসতে পারে। এটা ৪ হাজার ২০০ ডলারে নামতে পারে প্রতি আউন্স সোনার দাম। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আবার ৪ হাজার ৪০০ ডলারের ওপরে উঠে যাবে। তৃতীয় প্রান্তিকে সোনা সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতার নতুন রেকর্ড ৪ হাজার ৬৩০ ডলার ছাড়াতে পারে এবং চতুর্থ বা শেষ প্রান্তিকে তা ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মার্কেটে। ভালো মানের প্রতি ভরি সোনার দাম এখন ২ লাখ ২৭ হাজার টাকার বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
