মানব ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ ছিল প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় প্রত্যাবর্তন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার যে অনুপম দৃষ্টান্ত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্ব মানবতার জন্য আজও এক চিরন্তন আদর্শ হয়ে আছে। হিজরতের প্রায় আট বছর পর তিনি যখন মক্কায় ফিরে আসেন, তখন তার জীবনের বহু কষ্ট, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক পরিণতি ঘটে।
মক্কা ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মভূমি। এখানেই শৈশব ও কৈশোর কাটিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেন। এখানেই তিনি আল্লাহর নবুয়ত লাভ করেন এবং মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। কিন্তু কুরাইশরা তার দাওয়াত গ্রহণ না করে তাকে ও তার অনুসারীদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়।
অত্যাচার, অবহেলা ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয় স্বদেশ ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। এই বিচ্ছেদ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কেননা জন্মভূমি মক্কার প্রতি তার স্বভাবজাত ভালোবাসা ও মমতা ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী।
হিজরতের সময় মক্কা ত্যাগ করার মুহূর্তে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, মক্কার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘হে মক্কা! তুমি আমার কাছে কতই না প্রিয়! যদি তোমার লোকেরা আমাকে বের করে না দিত, তবে আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ উক্তিটি তার হৃদয়ে মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রমাণ।
মদিনায় অবস্থানকালে তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করলেও মক্কার স্মৃতি কখনো তার মন থেকে মুছে যায়নি। সুযোগ পেলেই তিনি মক্কার শান্তি, পবিত্রতা ও মানুষের হেদায়েতের জন্য দোয়া করতেন।
তাই যখন মহান আল্লাহ তাকে বিজয়ীর বেশে স্বদেশে ফেরার সুযোগ দিলেন, তখন তার আনন্দের সঙ্গে ছিল গভীর কৃতজ্ঞতা ও আবেগ।
দীর্ঘ বছর পর যখন মক্কা বিজয়ের সুযোগ আসে, তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা। বিজয়ের দিন তিনি বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি তার মহান রবের কৃতজ্ঞতা আদায় করেন। তার এই আচরণ প্রমাণ করে যে, তিনি ক্ষমতার অহংকারে নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
মক্কায় প্রবেশ করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমেই কাবাঘরকে মূর্তিপূজা থেকে পবিত্র করেন। কাবার চারপাশে থাকা মূর্তিগুলো অপসারণ করে তিনি ঘোষণা করেন, ‘সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলীন হয়েছে’। এটি ছিল তাওহিদের বিজয় এবং শিরকের পরাজয়। এরপর তিনি সেসব মানুষকে ক্ষমা করে দেন, যারা এক সময় তাকে নির্যাতন করেছিল, হত্যা করতে চেয়েছিল এবং স্বদেশ ত্যাগে বাধ্য করেছিল।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই ক্ষমার ঘোষণা মানব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। চরম শত্রুর বিরুদ্ধে একচ্ছত্র বিজয় লাভের পরও তিনি বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।’ এই মহৎ ঘোষণা বহু শত্রুর হৃদয়ে ঝড় তোলে এবং তাদের শক্ত-কঠিন হৃদয়ে ইমানের প্রস্রবণ সৃষ্টি করে। ফলে তারা স্বধর্ম ত্যাগ করে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
সেদিন মক্কা বিজয়, কুরাইশের পতন এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সত্যকে কখনো দমন করা যায় না। ধৈর্য, সহনশীলতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে মুমিনের বিজয় অবধারিত। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই মানুষের চরিত্রকে মহান করে তোলে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং মানবতার জন্য এক চিরন্তন আদর্শিক উপমা ও উপাখ্যান।
মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখিয়ে দেন, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা মানে অহংকার বা দমন নয়, বরং কল্যাণ, শান্তি ও ক্ষমা প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মক্কাকে রক্তপাত থেকে রক্ষা করেন এবং একে শান্তির নগরীতে পরিণত করেন। তার আচরণ আমাদের শেখায়, নিজের দেশকে ভালোবাসতে হলে তাকে ন্যায়, মানবতা ও নৈতিকতার আলোয় গড়ে তুলতে হয়। এভাবেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে চিরন্তন আদর্শে রূপ দিয়েছেন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার
