চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ওমরপুর ও ঘোষপুর মৌজায় অবস্থিত সুলতানি আমলের ঐতিহাসিক দরসবাড়ি মসজিদ। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান শামস উদ্দিন ইউসুফ শাহের নির্দেশে এটি নির্মিত হয়েছিল। বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের আদি যুগের সাক্ষী হয়ে আজও এটি টিকে আছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছে। পোড়ামাটির ফলক ও কারুকাজমণ্ডিত এই মসজিদটি কালের বিবর্তনে জরাজীর্ণ হলেও এর আবেদন ফুরায়নি। এই মসজিদটি পাঁচ শতাধিক বছরের পুরনো এক জীবন্ত ইতিহাস। গাছগাছালি পরিবেষ্টিত চারপাশ। পাখির ডাকে মুখরিত পরিবেশ। সবুজ দুর্বাঘাসে আচ্ছাদিত মাঠ। মাঠের মাঝখানে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি।
মসজিদটি এখন ভগ্নদশা হয়ে পড়ে আছে। উপরের ছাদ ভেঙে পড়েছে আগেই। আশপাশটা বেশ নির্জন। কেমন গা ছমছমে ভাব। লাল ইট খসে পড়েছে অনেক জায়গার। দেওয়াল জুড়ে শ্যাওলার আধিক্য। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় ৫৪০ বছরের পুরনো মসজিদটির দেওয়ালে এখনো সুন্দর কারুকার্য স্পষ্ট। অনেক স্তম্ভ ধসে পড়ে উঁচু হয়ে আছে। মসজিদের ভেতরও সবুজ দুর্বার গালিচা। খালি পায়ে হাঁটতে গেলে পা জড়িয়ে ধরে। কোনো কারণে একটা সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় মসজিদটি। অনেক দিন পর্যন্ত মাটির নিচেই চাপা ছিল। সত্তর দশকের প্রথমভাগে খনন করে এটিকে উদ্ধার করা হয়। পরিচর্যার অভাবে এখন যেন মৃতদশা। এর সংলগ্ন আরেকটি স্থাপনা হলো দারাসবাড়ি মাদ্রাসা। মসজিদে সঙ্গেই এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। দীঘির এক পারে মসজিদ এবং অন্য পারে মাদ্রাসা অবস্থিত।
মাটি খননকালে একটি আরবি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়। শিলালিপি অনুযায়ী, ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৮৮৪) সুলতান শামস উদ্দিন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তারই আদেশক্রমে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এই মসজিদের নাম ছিল পিরোজপুর মসজিদ। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে যখন সুলতান হোসেন শাহ কর্র্তৃক দরসবাড়ি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন অত্র অঞ্চলের নাম দরসবাড়ি নামে প্রসিদ্ধ লাভ করে। পিরোজপুর জামে মসজিদ নাম হারিয়ে হয়ে যায় দরসবাড়ি মসজিদ।
ইট নির্মিত এই মসজিদের অভ্যন্তরের আয়তক্ষেত্র দুই অংশে বিভক্ত। এর আয়তন ৯৯ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং ৩৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। পূর্ব পাশে একটি বারান্দা, যা ১০ ফুট ৭ ইঞ্চি। বারান্দার খিলানে সাতটি প্রস্তর স্তম্ভের ওপরের ছয়টি ক্ষুদ্রাকৃতি গম্বুজ ছিল। মাঝের গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। ওপরে ৯টি গম্বুজের চিহ্নাবশেষ এখনো রয়েছে। উত্তর দক্ষিণে তিনটি করে জানালা ছিল। উত্তর পশ্চিম কোণে মহিলাদের নামাজের জন্য প্রস্তর স্তম্ভের ওপরে একটি ছাদ ছিল। এর পরিচয়স্বরূপ এখনো একটি মেহরাব রয়েছে। এ ছাড়াও পশ্চিম দেওয়ালে পাশাপাশি তিনটি করে ৯টি কারুকার্য খচিত মেহরাব বর্তমান রয়েছে। মসজিদের চারপাশের দেয়াল ও কয়েকটি প্রস্তর স্তম্ভের মূলদেশ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখানে প্রাপ্ত তোগরা অক্ষরে উৎকীর্ণ ইউসুফি শাহী লিপিটি এখন কলকাতা জাদুঘরে রক্ষিত আছে।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার
