চার দশকের বেশি সময় নেতৃত্ব দিয়ে আসা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রয়াণের খবর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জায়গা পেয়েছে আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোয়। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তা প্রকাশ পেতে থাকে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, যুক্তরাজ্যের বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার মৃত্যু নিয়ে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তার মৃত্যুকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হিসেবে তুলে ধরেছে বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজনীতির মাঠে দলের হাল ধরে; রাজনীতিতে নবীন খালেদা জিয়া কীভাবে রাজপথ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠলেন, চির প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দীর্ঘ যাত্রা এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথ তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রেখে গেছেন সেসব উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ‘৮০ বছর বয়সী বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর গতকাল মঙ্গলবার মারা গেছেন। খালেদা জিয়াকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে রয়টার্স লিখেছে, ১৯৯১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন। প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার মামলা-কারাবরণ ও জীবনের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনাও উঠে এসেছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিবিসির প্রতিবেদনে তার ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরণের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি শিরোনাম করেছে, ‘খালেদা জিয়া : হত্যার শিকার নেতার বিধবা পতœী, যিনি বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন’। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা এবং রাজনীতিতে প্রবেশের আগে খালেদা জিয়া কেবল একজন লাজুক গৃহবধূই ছিলেন, সে কথাও স্মরণ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি দলের হাল ধরেন। এরপর তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন। এভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে সব থেকে প্রভাবশালীদের একজন হয়ে ওঠেন। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে খবর ছেপেছে গার্ডিয়ানও। বাংলাদেশের গোটা রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাকে তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও ‘বিতর্কিত’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদ্বের একজন ছিলেন তিনি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে শিরোনাম করা হয়, ‘৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন খালেদা জিয়া, বাংলাদেশে শোক’। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। টালমাটাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সংবাদমাধ্যমটি শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন’। দুই নেত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে বাংলাদেশে একটি প্রজন্মের রাজনীতির প্রেক্ষাপট তৈরি করে গেছে সেই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
‘পারিবারিক’ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়াকে উপস্থাপন করে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বংশগত বা পারিবারিকভাবে রাজনীতিচর্চা করে যাওয়া আরেক নারীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে গেছেন, যা তরুণ দক্ষিণ এশীয় দেশটির ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথপরিক্রমার ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে উপস্থাপন করেছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ। সংবাদমাধ্যমটি শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কারিগর খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন’। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, কয়েক বছর চলা সামরিক শাসনের পর গণতন্ত্র ফেরাতে সাহায্য করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাজনীতিতে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন।
পাকিস্তানি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ডন লিখেছে, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতায় ভুগে ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন’। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে তার কারাবরণের ঘটনা তুলে ধরেছে সেখানে। সেইসঙ্গে ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার মুক্তির কথাও লেখা হয়েছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোক ও শ্রদ্ধার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি শিরোনাম করেছে, ‘খালেদা জিয়া আর নেই : প্রধানমন্ত্রী মোদির গভীর শোক। বাংলাদেশের উন্নয়নে এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে।
