‘মব’ সন্ত্রাস ও হেফাজতে মৃত্যু আগের চেয়ে বেশি

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

বিদায়ী বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সার্বিকভাবে অস্থির ও উদ্বেগজনক বলছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ২০২৫ সালে অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে ‘মব’ নামে গণপিটুনিতে হত্যাকান্ডে। আসকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের বছর ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন। অর্থাৎ ২০২৪ সাল থেকে ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে মানুষ হত্যা বেড়েছে। অন্যদিকে কারা হেফাজতেও আগের চেয়ে মৃত্যু বেড়েছে বলে জানিয়েছে আসক। সংস্থাটির তথ্য মতে, বিদায়ী বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬৯ জন হাজতি এবং ৩৮ জন কয়েদি। সর্বোচ্চ ৩৮ জন মারা গেছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ২০২৪ সালে কারাগারগুলোতে মারা গিয়েছিলেন ৬৫ জন। এদের মধ্যে ৪২ জন হাজতি এবং ২৩ জন কয়েদি ছিলেন।

গতকাল বুধবার আসক ২০২৫ সালে সার দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে। আসক বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকারের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং পুরনো নিপীড়ন-পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে বহমান রয়েছে। দমনমূলক শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতাহীন এবং বৈষম্যমূলক আচরণকে নিষ্কণ্টকভাবে টিকিয়ে রেখেছে। যা মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সার্বিকভাবে অস্থির ও উদ্বেগজনক বলে বিবেচিত হয়েছে। ২০২৫ সালে সংগঠিত মব সহিংসতাগুলো বিশ্লেষণ করে আসক বলছে, রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ মব সহিংসতাগুলো সংঘটিত হয়।

আসকের হিসেবে ২০২৫ সালে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাও অব্যাহত ছিল এবং এতে কমপক্ষে ৩৮ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, এ সব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, নির্যাতনে, কথিত ‘গুলিতে’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে।

আসকের প্রতিবেদনে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে সংঘটিত পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং এর ফলে সেখানে কর্মরত সাংবাদিক, প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনা মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর সরাসরি ও গুরুতর আঘাত।

বছরজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্মৃত ও সহিংসতা হয়ে উঠেছে। আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১০২ জন নিহত ও প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত হয়েছেন।

বছরজুড়ে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির বিষয়ে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য পাওয়া  গেছে। এ সময়ে দুর্বৃত্ত কর্তৃক হত্যার শিকার হয়েছেন তিনজন সাংবাদিক এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা  থেকে রহস্যজনকভাবে চারজন সাংবাদিকের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।

আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভয়ভীতি, লুটপাট, আগুন ও প্রতিমা ভাঙচুরের মতো একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এই বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি বসতঘরে। এ ছাড়া চারটি মন্দিরে হামলা, ৬৪টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ধর্ষণের  মোট ৭৪৯টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৬৯টি ছিল একক ধর্ষণ এবং ১৮০টি দলবদ্ধ ধর্ষণ। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই শিশু ও কিশোরী। বিদায়ী বছরে শিশু অধিকারের বিষয়ে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে অন্তত ৪১০ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, আত্মহত্যা এবং বিস্ফোরণে মৃত্যু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৯ জন শিশুকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত