সহজ সরল ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের গূঢ়সত্য

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম

এদেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দেশের আপামর জনসাধারণের অবদান। বাংলার কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, লেখক-সাংবাদিক-চিকিৎসক, নারী-পুরুষ-শিশু সবাই নিজেদের সাধ্যমতো অংশ নিয়েছিল। প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অর্জিত এ বিজয়ের ইতিহাস আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারিনি। বিজয়ের পরে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী বীররা ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জীবনধারণ সহজ নয়। কালের স্রোতে অনেকেই হারিয়ে গেছেন।

সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের যুদ্ধাভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম। তবে প্রামাণ্য ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলেও তাদের জীবন চলার পথে অন্যদের সঙ্গে কথোপকথনে যেসব ঘটনা উঠে এসেছে যুদ্ধের, সেসব রোমহর্ষক ঘটনা পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে সাহিত্য রচনার।

এই সাহিত্যগুলোতে উঠে এসেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা, নিপীড়নের ভয়াবহতা আর বাঙালির অটুট মনের অসীম দৃঢ়তা। মুক্তিযুদ্ধের ওপর এসব সাহিত্যের কোনো কোনোটি শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য নিবেদিত।

মাহবুব রেজা রচিত ‘যুদ্ধে যাবার দিন’ গল্পগ্রন্থটি তেমন একটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্প সংকলন। এই সংকলনে মোট পনেরোটি গল্প রয়েছে। আকস্মিক যুদ্ধ কিশোর মনকে কীভাবে আলোড়িত বা প্রভাবিত করে তা-ই উঠে এসেছে গল্পগুলোতে।

গল্পগুলো হলো, এই গল্পটা মুক্তিযুদ্ধের, স্বপ্নের রাজপুত্তুর, ২৪ বসু বাজার লেন, মেয়েটার নাম চিত্রা, হাড়ের বাঁশি, জলিল সাহেবের গল্প, ইউক্যালিপটাস, পোড়োবাড়ির রহস্য, টোকা, সুইপার কলোনি, ভূতেরা কেমন হয়, যুদ্ধে যাবার দিন, অন্য, বন্ধু আমার এবং লরার জন্য।

গল্পগুলোতে লেখক শব্দের কারুকার্যে টুকরো টুকরো দৃশ্য মূর্ত করে কিশোর পাঠকদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো তুলে ধরেছেন। প্রথম গল্পে লেখক দেখান এক জনমানবহীন পরিবেশে একজন বালকের সন্তর্পণে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই আতঙ্কময় দিনে এভাবে ঘুরতে দেখে একজন তাকে বললেন, তোমার বাজান কই? একলা একলা বাড়ির বাইরে বয়া থাইকো না। চাইরদিকের ভাবগতিক বালা না। ঘরের ভিত্তে যাওগা!

এই কথা শুনে বালক কিছু বলে না। কারণ যার বাবা মারা গেছে সে আর কার কাছেই বা আশ্রয় নেবে? যে ভয়ের কথা বলে মাঝি সতর্ক করছে, ইতোমধ্যে ঘটে গেছে সেই ভয়াবহ ঘটনা। তার বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা লেখকও নির্মমভাবে তুলে ধরেছেন তার লেখনীতে। ‘বাবার ছবি মানে বাড়ির পাশে নামাজমির ডুবে যাওয়া কচুক্ষেত। কালচে-সবুজ রঙের কচুর ডগা। বাড়বাড়ন্ত পাতা। তার নিচে টলটলে পানি। কোমর পানি, তারপরও মাটি পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। বাবার গুলিবিদ্ধ লাশ। বুকে অসংখ্য গুলি। গুলিতে বুকটা ঝাঁজরা হয়ে গেছে। বুকের ভেতরের হাড় দেখা যায়। একটা চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। বাকি চোখটা খোলা। বাবা পানিতে ভাসতে ভাসতে যেন এক চোখে আকাশ দেখছেন। পরনে হাতাঅলা ঘিয়ে রঙের গেঞ্জি। ঢিলেঢালা পাজামা। বাবার লাশ ঘিরে মাছেদের ব্যস্ততা। কচুর ডগা আর লতাপাতার ভেতর দিয়ে বাবার লাশ পরিষ্কার বোঝা যায়। সন্ধ্যার আকাশে চিলদের নিবিড় ওড়াউড়ি আর কাক-শকুনের চিৎকার পুরো বাড়ির পরিবেশকে আরও বিষণœ আর ভারী করে তুলছিল।’

একে একে সে আবিষ্কার করে তাদের গরু দুটোকে গুলি করে মারা হয়েছে, দক্ষিণের ঘরে পড়ে আছে সুনীল কাকু, তার গায়ে অসংখ্য বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন। এভাবেই ‘এই গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের’ গল্পটির প্রথম কয়েক ছত্রের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং এই ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে কিশোরের মনে যে অসাড় ভাব জন্ম নিয়েছিল সেটি ফুটিয়ে তুলেছেন।

মা, মাটি, জন্মভূমির টান বড় টান। সে টানের জন্যই গল্পের নায়ক হেমচন্দ্র এই মৃত্যুপুরী ছেড়ে যেতে পারে না। যেমন যেতে পারেনি তার বাবাও। হেমচন্দ্রের মা ও বোনকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিলেও তারা বাড়ি অরক্ষিত রেখে যেতে পারেনি। প্রতিবেশী রেখাদির স্নেহমাখা কণ্ঠের অনুরোধেও সে তার প্রতিজ্ঞা থেকে বিচ্যুত হয়নি। বাবার মতো সে একই প্রতিজ্ঞা করে, যদি মরতেই হয় তবে শত্রুদের দু-একটিকে মেরে তবেই মরবে।

রাজাকার সোলেমান এলে সে প্রতিজ্ঞা রক্ষার সেই সুযোগ পায়। সোলেমান রাজাকারের মিথ্যা কথাই প্রভাবিত সে হয় না, সে বুঝতে পারে বাবা ও কাকার মৃত্যুর পেছনে এই রাজাকার সোলেমানই দায়ী। সে জন্য সে অস্ত্র তুলে নেয় এবং সোলেমানকে গুলি করে হত্যা করে। এই অল্প কয়টি কথায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ফুটে উঠেছে। এ দেশের সাধারণ মানুষ শুধু নিজেদের মতো শান্তিতে বাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। উপায়ান্তর না দেখে বাঙালি রুখে দাঁড়ায়। ঘর বাঁচাতে আক্রমণকারীদের ধ্বংস করতে অস্ত্র তুলে নেয়। সহজ ভাষায় গূঢ় সত্যকে এভাবেই তুলে ধরে সাহিত্য। বইটির বাকি চৌদ্দটি গল্পও এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরেছে।

মাহবুব রেজার এই গল্পগ্রন্থটি তোমাদের ভালো লাগবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত