কোরআনে ভ্রমণের তাগিদ

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১১ এএম

ইসলামে ভ্রমণের গুরুত্ব অপরিসীম। ভ্রমণ মানুষের মনকে উদার করে, জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়, জ্ঞান অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মহান আল্লাহর সৃষ্টি জগতের রহস্য অবলোকন, তার কুদরত এবং সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে অবগত হয়ে জ্ঞান অর্জন করা ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে তারা হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারত, তাদের কান শুনতে পারত। প্রকৃতপক্ষে চোখ অন্ধ নয়, বরং বুকের ভেতর যে হৃদয় আছে তাই অন্ধ।’ (সুরা হজ ৪৬)

মানুষ সাধারণত দুভাবে জ্ঞান অর্জন করে থাকে। বই পুস্তক পড়ে এবং ভ্রমণ করে। তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করতে বই-পুস্তক সহায়ক হলেও বাস্তব ও জীবন ঘনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জনে বই-পুস্তকের ভূমিকা একেবারেই অপ্রতুল। মানুষ জীবন ঘনিষ্ঠ ও বাস্তব জ্ঞান অর্জনে ভ্রমণ বা দেশ-বিদেশ ঘুরে থাকে। পবিত্র কোরআনে ভ্রমণ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘(হে রাসুল) বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো। অতঃপর লক্ষ্য কর কীভাবে আল্লাহ সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর আল্লাহ সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি, আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান।’ (সুরা আনকাবুত ২০)

মহান রবের সৃষ্টিকর্মের গভীরতা সৃষ্টির নানা রহস্য ভ্রমণের মাধ্যমে অবলোকন করা যায়। ভ্রমণ শুধু চিত্ত বিনোদনের জন্য নয়, বরং ভ্রমণের মাধ্যমে চিন্তাশীল মনোভাব তৈরি ও চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়। ইতিহাসে অসংখ্য জ্ঞানীগুণী ভ্রমণের মাধ্যমে অমর হয়েছেন। ইসলামে ভ্রমণের গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কোরআনে ১৩ বারের বেশি ভ্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে এবং অভিজ্ঞ করে তোলে।

হযরত মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রজ্ঞাবান হওয়া যায় না। ভ্রমণে অনেক সময় প্রতারণার শিকার হতে হয়। তবে ইসলাম এমন প্রতারিত হওয়াকে শিক্ষায় রূপান্তরিত করে। যেমন হাদিসে এসেছে রাসুল (সা.) বলেন, মুমিন কখনো একই গর্তে দুবার পতিত হয় না। (সহিহ বুখারি) পৃথিবীর প্রতিটা স্থানেরই রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। মানুষ ভ্রমণের মাধ্যমে সেই সকল অজানা বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে অবগত হয়। ভ্রমণের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করতে আল্লাহতায়ালা ভ্রমণকারীর জন্য নামাজ ও রোজার বিধান শিথিল করে দিয়েছেন।

ইসলামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভ্রমণের প্রতি নির্দেশনা এসেছে, যেমন ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি হজ, যা সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর জীবনে একবার আদায় করা ফরজ। এটা এ জন্য যে, আল্লাহর ঘর, ইসলামের অসংখ্য নিদর্শনাবলি এবং ইসলামিক স্থানগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে মানুষ যেন আল্লাহমুখী হয়। ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রোকন জাকাতের অর্থ বিত্তহীন মুসাফিরকে দান করার বিধান থেকেও ভ্রমণের প্রতি গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।

বই-পুস্তক পাঠের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে যে জ্ঞানের বীজ অঙ্কুরিত হয়, তা ভ্রমণের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। এ জন্য শেখ সাদী (রহ.) বলেছেন, পৃথিবীতে দুই শ্রেণির লোকজন সর্বোচ্চ জ্ঞানী। তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে ভাবুক বা চিন্তাশীল ব্যক্তি। আর অপরজন হচ্ছে ভ্রমণকারী। শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি উপলব্ধি করতে ভ্রমণের বিকল্প নেই। সফরে বান্দার দোয়া আল্লাহতায়ালা কবুল করেন। ভ্রমণকারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। ভ্রমণ কেমন হবে সে সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। যেমন ভ্রমণের সঙ্গী-সাথি সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, ভ্রমণে এক বা দুজন সঙ্গীর চেয়ে তিনজন সঙ্গী অধিক উত্তম। তিনজনের ভ্রমণকে কাফেলা বলা হয়। এক-দুজনের ওপর শয়তানের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু তিনজনের ওপর সম্ভব না। (তিরমিজি)

ইসলামে ভ্রমণের ফজিলত অত্যধিক। ইসলাম কখনো ভ্রমণের প্রতি নিরুৎসাহিত করেনি। কেউ যদি সওয়াবের আশায় ভ্রমণ করে, তবে তার পুরো সফরটাই নেক আমলে পরিণত হবে। ভ্রমণকারীদের জন্য ইসলাম ফরজ নামাজ কসর (সংক্ষিপ্ত) করার অনুমতি দিয়েছে। ইসলামে লোকদের ভ্রমণের প্রতি উৎসাহিত করতে তাদের পূর্ববর্তী লোকদের কীর্তি সম্পর্কে জানাতে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে রাসুল) আপনি বলুন, পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো। অতঃপর দেখ আগে যারা ছিল তাদের পরিণাম কী হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।’ (সুরা রুম ৪২)

পবিত্র কোরআনের অন্যত্র এসেছে, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে দেখে না যে, তাদের পূর্ববর্তী লোকেদের পরিণাম কী হয়েছিল? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই পরলোকের ঘর তাদের আরও উত্তম, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?’ (সুরা ইউসুফ ১০৯) ইসলামি আইন শাস্ত্রবিদদের মতে, সকল মুসলমানের উচিত আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে সমর্থ্য অনুযায়ী সফর করা। নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে বের না হলে সৃষ্টি জগতের অনেক কিছুই অচেনা বা অজানা রয়ে যায়। ভ্রমণে রুগ্ন ও দুর্বল ইমান দৃঢ় ও সতেজ হয়ে ওঠে। স্রষ্টার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি ভ্রমণকারীকে আন্দোলিত করে। ভ্রমণ মানুষকে ধৈর্যশীল হতে সাহায্য করে। বাস্তব জীবনে একটি স্পষ্ট লক্ষণীয় হলো, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যার যত বেশি, তার জ্ঞানভাণ্ডারও তত বেশি সমৃদ্ধ।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, ঢাকা কলেজ হাফেজ অ্যাসোসিয়েশন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত