মানবজীবনের সফলতা, মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার রহস্য লুকিয়ে আছে পরিশ্রমে। মহান আল্লাহ জ্ঞান, বুদ্ধি ও কর্মক্ষমতার মাধ্যমে মানুষের জীবিকা অর্জনের পথ উন্মুক্ত করেছেন। ইসলাম কখনো অলসতা, পরনির্ভরশীলতা বা ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করেনি। আত্মনির্ভরতা ও শ্রমনিষ্ঠ জীবনযাপনকে গুরুত্ব দিয়েছে। পরিশ্রম সফলতার চাবিকাঠি। পরিশ্রম ছাড়া কেউ কখনো পরিপূর্ণ সফল হতে পারে না।
পবিত্র কোরআনে মানুষকে পরিশ্রমী হতে এবং নিজের হাতে জীবিকা উপার্জন করতে শেখানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর (জুমার) নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করো। আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত ১০)
হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বোচ্চ পরিশ্রমী ও স্বাবলম্বী মানুষ। নবুয়তের আগেই তিনি ব্যবসা করতেন, মানুষের আমানত রক্ষা করতেন এবং সততা ও পরিশ্রমে ছিলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি শিখিয়েছেন, নিজ হাতে উপার্জন করা ইমানদারের জন্য সম্মানের, আর ভিক্ষা করা আত্মসম্মানহানির কারণ।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, এক আনসারি ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে কিছু চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ঘরে কিছুই নেই?’ লোকটি বলল, ‘একটা কম্বল আছে, যার একাংশ আমরা গায়ে দিই এবং অন্য অংশ বিছাই। আরেকটা পানপাত্র আছে, যা দিয়ে পানি পান করি।’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘সেগুলো নিয়ে এসো।’
নবীজি সেই জিনিসগুলো হাতে নিয়ে সাহাবিদের সামনে বললেন, ‘এই দুটো জিনিস কে কিনবে?’ একজন বললেন, ‘আমি এক দিরহাম দেব।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘এর চেয়ে বেশি দেবে কে?’ তখন আরেকজন দুই দিরহামে কিনে নিল। নবীজি (সা.) আনসারিকে সেই দুই দিরহাম দিয়ে বললেন, ‘এর একটি দিয়ে খাদ্য কিনে তোমার পরিবারকে দাও, আরেকটি দিয়ে কুঠার কিনে আমার কাছে নিয়ে এসো।’
লোকটি কুঠার কিনে নিয়ে এলে মহানবী (সা.) নিজ হাতে তাতে হাতল লাগালেন এবং বললেন, ‘এখন যাও, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনো ও বিক্রি করো। পনেরো দিন পর্যন্ত তোমাকে এখানে দেখতে চাই না।’ নবীজির নির্দেশ মতো সে পরিশ্রম শুরু করল। কিছুদিন পর ফিরে এসে জানাল, তার কাছে দশ দিরহাম সঞ্চিত হয়েছে। মহানবী (সা.) বললেন, ‘এর কিছু দিয়ে কাপড় কিনে নাও, কিছু দিয়ে খাদ্য কিনে খাও। ভিক্ষার কারণে কেয়ামতের দিন তোমার মুখে লজ্জার চিহ্ন থাকার চেয়ে এভাবে উপার্জন করা তোমার জন্য উত্তম।’ (সুনানে আবু দাউদ ২১৯৮)
ভিক্ষা সম্মানজনক কোনো পেশা নয়, বরং তা আত্মমর্যাদার পরিপন্থী। তাই আমাদের উচিত নবীজির শিক্ষা অনুসরণ করে কর্মমুখী জীবন গড়ে তোলা, পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা এবং সমাজে মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
