তফসিল অনুযায়ী ৩৭ দিন পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে ইসি বৈঠক করে নানা দিকনির্দেশনা দিলেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অশঙ্কা যেন কাটছেই না। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর আলাদাভাবে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘বিশেষ অভিযান’ চালানোর সিদ্ধান্ত হলেও নাম নিয়ে কিছুটা দোটানায় পড়ে কর্তৃপক্ষ। প্রথম দফায় ‘ডেভিল হান্ট’ নামে অভিযান ও পরে ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামে আরেকটি বিশেষ অভিযান চালাতে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে নির্দেশ দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। তবে দুটি অভিযানের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ইতিমধ্যে অভিযানে পুলিশের ‘ঢিলেঢালা ভাব’ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। নামকরা অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় থানাসহ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের হদিস না মেলায় নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে আছে দুশ্চিন্তা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ডেভিল হান্টের ফেজ-১ অভিযানে ১২ হাজার ২২০ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৮৮টি দেশীয় অস্ত্র। পরে ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিসহ ধরা হয় কয়েক হাজার ব্যক্তিকে। তবে চিহ্নিত অপরাধীদের ধরা সম্ভব হয়নি। এমনকি গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধী ও মামলার আসামিদের বড় একটি অংশ পরে জামিনে মুক্তি পেলেও পুলিশের কাছে নেই নির্দিষ্ট তথ্য। অভিযানের মাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত বছর ১২ ডিসেম্বর ঢাকার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলির ঘটনা ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল এর আগে ডেভিল হান্ট অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা জানিয়েছেন। এ ঘটনার পর তোলপাড় শুরু হয় দেশ-বিদেশে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডেভিল হান্ট ফেজ-২ নামে আরেকটি বিশেষ অভিযান শুরু হয়। কয়েক দিন অভিযান চলার পর বর্তমানে ‘নামেই চলছে’ ডেভিল হান্টের কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার গত ফেরুয়ারিতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। দীর্ঘদিন চলার পর সেই অভিযান কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। যদিও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো বরাবরই দাবি করে আসছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান নিয়মিতভাবে চলমান রয়েছে। যারা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে, তাদের ডেভিল (শয়তান) আখ্যায়িত করে অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট। পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে বৃহত্তর পরিসরে পরিচালিত এ যৌথ অভিযানটির প্রথম দফা ঘোষণা করা হয় গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি।
আনুষ্ঠানিকভাবে ফেজ-১-এর অভিযান চলে ২ মার্চ পর্যন্ত। এরপর নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলেও সেটিকে আর ডেভিল হান্ট অপারেশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ১৩ ডিসেম্বর ডেভিল হান্ট ফেজ-২ নামে আরেকটি অভিযান শুরু হলেও আগেরটি মতোই চলছে। ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৫৪১ রাউন্ড গুলি, ৫৬৬ রাউন্ড কার্তুজ, ১৬৫টি দেশীয় অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি, বোমা তৈরির উপকরণ ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়। এ সময় মামলা ও ওয়ারেন্টমূলে ১৯ হাজার ২৩৫ জনসহ ৩৩ হাজার ৮০৪ জনকে ধরা হয়েছে। তবে দাগি অপরাধীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের প্রতিটি ইউনিট কাজ করছে। ডেভিল হান্ট অভিযানে সফলতা আসছে। চিহ্নিত অপরাধী ধরা পড়ছে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যা যা করা দরকার, আমরা তাই করছি। আশা করছি একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারব।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো মাঝেমধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে আমরা আছি দুশ্চিন্তায়। অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কারও প্রতি নির্যাতন, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না। মব জাস্টিসের নামে জোটবদ্ধ হয়ে হামলা-ভাঙচুরের অনেক ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্মকর্তাকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া, আদালত এলাকায় আসামিদের ওপর হামলা এক ধরনের প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে ঘটেছে। এসব হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ দেশ জুড়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমলেও আতঙ্ক রয়ে গেছে। ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এর অভিযানে তেমন একটা সফলতা আসছে না। এ নিয়ে সরকারের হাইকমান্ডও কিছুটা চিন্তিত। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এর অভিযানে নামকরা অপরাধী ও জুলাই হত্যাকা-ে সম্পৃক্ত অনেককে আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলেও চেষ্টার কমতি নেই। পুলিশের প্রতিটি সদস্য নানাভাবে চেষ্টা করছেন। ‘অলস’ বা ‘ভাব’ নেওয়া সদস্যদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দারা কাজ করছে।
কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা চাপের মধ্যে আছি। ডেভিল হান্টের অভিযানেও অপরাধ হচ্ছে। মবের কোনো ঘটনা ঘটলে ছাত্র পরিচয় দিলে পুলিশ আর সামনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। আবার অনেক সময় দেখাও গেছে, ছাত্র পরিচয় দিয়ে দুর্বৃত্তরাও মবে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করেছি মব ঘটলেই প্রতিরোধ করতে হবে। আর না হয় কোনো কৌশলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। আমরা আরও তথ্য পেয়েছি, কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি পথশিশুরাও আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরাও পাল্টে গেছে। চরমপন্থিরাও আগের চেয়ে তৎপর। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা জামিনে বের হয়ে তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক জানিয়েছেন, হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। এ কারণেই সরকার দ্বিতীয় দফায় ডেভিল হান্ট অভিযান শুরু করেছে। ছত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানাসহ পুলিশের স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
