বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত উত্তরের জেলা নওগাঁর সংসদীয় আসন ছয়টি। এর মধ্যে একাধিক আসনে বিএনপির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জামায়াতে ইসলামী দলের প্রার্থীরা। ছয়টি আসনের চারটিতেই রয়েছে বিএনপির হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী। আর বাকি দুটি আসনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে যাদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, তাদের ওপরই ভরসা রেখেছে বিএনপি। জামায়াতের শক্ত অবস্থান, পাশাপাশি দলের মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। ছয়টি আসনেই অনেক আগেই জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে এবং দীর্ঘদিন ধরেই প্রচারণার কাজ করে আসছেন তাদের প্রার্থীরা। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য দলের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক না থাকায় বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অবস্থানে নেই এসব দল। মূল লড়াই হবে বিএনপি এবং কোনো আসনে জামায়াতে ইসলামী আবার কোনো আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিয়ে বেশ জল্পনা-কল্পনা চলছে। ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ভোটাররা ভোট প্রদান করতে গেলে বিএনপি লাভবান হবে বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদরা।
নওগাঁ-১ (পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর) : এ আসন থেকে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী সালেক চৌধুরী। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দখলে ছিল আসনটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. সালেক চৌধুরীকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে মোহা. মাহবুবুল আলমকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মো. আব্দুল হক শাহ্ মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন মো. আকবর আলী। পোরশা ছয়টি, সাপাহার ছয়টি ও নিয়ামতপুর আটটি ইউনিয়ন নিয়ে এ সংসদীয় আসন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫ জন।
নওগাঁ-২ (পত্নীতলা-ধামইরহাট) : এ আসনে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬-২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী শামসুজ্জোহা খান নির্বাচিত হন। ২০০৮-২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দখলে ছিল আসনটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. শামসুজ্জোহা খানকে এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে মো. এনামুল হককে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মো. দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে মো. বিএসএ হুমাযুন কবির চৌধুরী, এবি পার্টি থেকে মো. মতিবুল ইসলাম, খেলাফত মজলিস থেকে মো. আব্দুর রহমান মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। নওগাঁ জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী মনোনয়ন উত্তোলন করলেও পরে তা জমা দেননি। এ আসনে বিএনপি- জামায়াতের মূল লড়াই হবে। পত্নীতলায় ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং ধামইরহাটে আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে আসনটি গঠিত। এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪৩৬ জন।
নওগাঁ-৩ (বদলগাছী-মহাদেবপুর) : ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী জয়লাভ করেন। ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্র্র্থী জয় পান। মাঝে ২০১৪-তে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচিত হন। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলে হুদাকে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই বিএনপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তার মনোনয়ন বাতিলের জন্য দীর্ঘদিন বিক্ষোভ করেছিলেন নেতাকর্মীরা। সাবেক সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী বিএনপির দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাহফুজুর রহমান, জাতীয় পার্টির মো. মাসুদ রানা, বাসদের কালিপদ সরকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নাসির বিন আছগর, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মো. সাদ্দাম হোসেন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এ আসনের বদলগাছী উপজেলার অধিকাংশ সংখ্যালঘু ভোটার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রার্থী ফজলে হুদার হাত ধরে বিএনপিতে যোগদান করেন এবং তাকে সমর্থন জানান। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকীর মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে রাজনীতিবিদরা ধারণা করছেন। মহাদেবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. রবিউল আলম মনোনয়ন উত্তোলন করলেও পরবর্তীকালে তিনি তা জমা দেননি। বদলগাছীতে ৮টি ও মহাদেবপুরে ১০টি ইউনিয়ন রয়েছে। এ আসনে ভোটার ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪৮৫ জন।
নওগাঁ-৪ (মান্দা) : ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী, এরপর ১৯৯৬-২০০৮ সাল পর্যন্ত দখলে ছিল বিএনপির। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, ২০১৪ ও ২০১৮-তে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য ইকরামুল বারী টিপুকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকে প্রার্থিতা পরিবর্তন করে আব্দুল মতিনকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করে আসছিল বিএনপির একাংশ। নওগাঁ জেলা জামায়াতের আমির মো. আব্দুর রাকিব দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে সোহরাব হোসাইন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে ডা. এসএম ফজলুর রহমান, জাতীয় পার্টি থেকে মো. আলতাফ হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মোসা. আরফানা বেগম ও মো. আব্দুস সামাদ প্রামাণিক মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। অনেকের মতে, এ আসনে জামায়াতের ভালো ভোটব্যাংক রয়েছে। সংখ্যালঘুর সংখ্যাও বেশ। আওয়ামী লীগ ভোটে অংশ নিতে না পারায় তাদের ভোট নিজেদের বাক্সে নিতে চেষ্টা করবে বিএনপি। এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় দলীয়ভাবেও বেশ ভালো সমর্থন পাবেন বিএনপির প্রার্র্থী। এ আসনে ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬০ জন।
নওগাঁ-৫ (সদর) : ১৯৯১-২০০১ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেন। ২০০১, ২০০৮, ২০১৩ উপনির্বাচন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এবারের নির্বাচনে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম ধলুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপি তাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। জামায়াত তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু সাদাত মো. সায়েমকে। জাহিদুল ইসলাম ধলুকে প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকে প্রার্থী পরিবর্তন করে সাবেক পৌর মেয়র মো. নজমুল হককে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করে আসছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক পৌর মেয়র মো. নজমুল হক মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। জেলা সদরের এ আসনটিতে বিএনপির মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে নওগাঁ সদর আসন গঠিত। এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩০ জন।
নওগাঁ-৬ (রানীনগর-আত্রাই) : ১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত দখলে ছিল বিএনপির। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২০-এর উপনির্বাচনে জয় পান আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ২০২৪-এর জাতীয় নির্বাচনে জেতেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে শেখ মো. রেজাউল ইসলামকে। তিনি ২০২০-এর উপনির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। এ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির। তাকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী করা হয়েছিল। জানা গেছে, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের একটি ভোটব্যাংক রয়েছে, যার কারণে বিএনপির মূল ফ্যাক্টর হবেন তিনিই। রানীনগর আটটি ইউনিয়ন ও আত্রাই আটটি ইউনিয়ন নিয়ে এ সংসদীয় আসন। ভোটার ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৬ জন।
