আজ বৃহস্পতিবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখবে তারা।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সারা দেশের পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য এমন এক নোটিস জারি করেছে ব্যবসায়ী সমিতি। এতে বলা হয়, সব কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ থাকবে।
এর আগে গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের দাবি তুলে ধরে এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতি। সেখানে কমিশন বৃদ্ধি, জরিমানা বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি না মানলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সরবরাহ ও বিপণন বন্ধের হুমকি দিয়েছিল সংগঠনটি। আর সন্ধ্যায় বন্ধের নোটিস জারি করে।
ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, ‘এলপিজি পরিবেশক আমাদের লাইসেন্সি না হওয়ায় আইনগতভাবে তাদের দাবি আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রস্তাব আসতে হবে লাইসেন্সির (আমদানিকারক) দিক থেকে। আমদানিকারক আবেদন করলে যাচাই-বাছাই শেষে গণশুনানি করে তারপর সিদ্ধান্ত দিতে হবে। গণশুনানিতে তাদের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে।’
বর্তমানে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চরম সংকটময় মুহূর্ত চলছে বলে দাবি করেছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনটি বলছে, ২৭টি কোম্পানির সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল (পুনরায় গ্যাস ভরা) হচ্ছে। তার মানে বাকি ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে।
প্রেস ক্লাবের কর্মসূচিতে সংগঠনটির সভাপতি সেলিম খান বলেন, অধিকাংশ সিলিন্ডার খালি থাকায় পরিবেশকদের খরচ বেড়ে গেছে। বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির এটি অন্যতম কারণ। বেশিরভাগ কোম্পানি বন্ধ, তাই তাদের পরিবেশকরা দেউলিয়া হওয়ার পথে। পড়ে থাকা সিলিন্ডারে এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিইআরসি থেকে নতুন করে এলপিজির মূল্য সমন্বয় এবং প্রশাসন দিয়ে পরিবেশকদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধ করতে হবে। এসব দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ থাকবে।
তবে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাংবাদিকদের বলেন, এলপিজি নিয়ে কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ‘কারসাজির’ ফল। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে এবং দাম কমে আসবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় জরিমানাও করা হচ্ছে।
এর আগে গত রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক জরুরি বৈঠকে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন এলপিজি প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। গত বছর ডিসেম্বরে ব্যবসায়ীরা প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেন, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।
ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, বর্তমানে এলপিজি আমদানিতে তারা একাধিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। সরকার এখনই হস্তক্ষেপ না করলে ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তারা।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, কিছু পাইকার ইতিমধ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, ফলে বাজারে এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিইআরসি পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই মূল্য সমন্বয় করেছে। এলপিজির সংকট দূর করায় জোর না দিয়ে বাড়তি দাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার অভিযান চালিয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে। এতে অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বলা হয়, জ্বালানি বিভাগ, বিইআরসি ও এলপিজি কোম্পানি মিলে আমদানি সমস্যা দূর করা ছিল সঠিক সমাধান। তা না করে অভিযান চালিয়ে পরিবেশকদের হয়রানি করা হচ্ছে। পরিবেশক কমিশন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা করার দাবি জানিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সহসভাপতি হারুন অর রশিদ, অর্থ সম্পাদক আবু তাহের কোরেশি প্রমুখ।
চলতি মাসের জন্য বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, যা গত বছর ডিসেম্বরের চেয়ে ৫৩ টাকা বেশি। তবে বাজারে বাস্তবে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন, বিভিন্ন খুচরা দোকানে এই সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার টাকা বা এর চেয়েও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।
