‘ঘরে চুলা জ্বালেনি কিনে খাচ্ছি খাবার’

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৬ এএম

কমিশন বৃদ্ধি, অভিযান বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘটে দেশ জুড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ভোক্তারা। পরে সরকারের তরফ থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস পেলে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওই ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন তারা।

এদিকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতির সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

এলপিজির দাম নিয়ে দেশ জুড়ে চরম নৈরাজ্য শুরু হলে অভিযান ও জরিমানা আদায় শুরু করে ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রশাসন। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। গতকাল থেকে তারা এ কর্মসূচি পালনের অংশ হিসেবে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সব কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ রাখার কথা বলেছিল। সমিতির তরফে ওই ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতারা পুরোদমে বিক্রি বন্ধ করে দেন। আগে থেকে চলতে থাকা সংকটের কারণে এমনিতেই এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল কম। কোথাও পাওয়া গেলেও দিতে হচ্ছিল অনেক বেশি দাম। এর মধ্যে সকাল থেকে একেবারে বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে যাদের গ্যাস শেষ হয়ে গেয়েছিল, তারা পড়েন বিপাকে। ডিলার পয়েন্টগুলো খোলেনি। রাজধানীর অনেক বাসিন্দার বাসায় চুলা না জ্বলায় দোকান থেকে খাবার কিনে আনতে হয়।

ধর্মঘটের এ সুযোগও কোনো কোনো এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের নিতে দেখা যায়। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম কেউ কেউ রাখেন প্রায় আড়াই হাজার টাকা।

রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা কাউসার আহমেদ জানান, ঢাকার বাইরে থাকায় তিনি তার বাসায় এলপিজি কিনতে পারেননি। হঠাৎ করে ধর্মঘটের কারণে চরম বিপাকে পড়েন। পরে বাধ্য হয়ে ২৪৫০ টাকা দিয়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে তাকে।

পল্লবী এলাকার বাসিন্দা আকমল হোসেন জানান, এলপিজি কেনার উদ্দেশ্যে সকালে বাইরে বের হয়ে দেখেন কেউ বিক্রি করবে না। উপায় না পেয়ে হোটেল থেকে খাবার এনে দিন পার করেছেন।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ রাখার মতো কঠোর কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে সরকারও দিনের প্রথম ভাগে তৎপর হয়। এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আলোচনার জন্য সমিতির নেতাদের ডেকে পাঠায়। বৈঠকে নেতারা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন। এগুলো হলো সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বৈঠক শেষে সমিতির সভাপতি সেলিম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমাদের যেসব দাবি ছিল, সেগুলো তিনি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এ কারণে আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছি।’

বৈঠকে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে, চলমান অভিযানের বিষয়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন।

সংকট কাটাতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ : এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিতে ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতির সুপারিশ করেছে জ্বাালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেওয়ার কথাও জানানো হয়।

সরবরাহ সংকট, কারসাজির অভিযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযানের মধ্যে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো ‘এলপি গ্যাস আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক চিঠিতে বলা হয়, দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয়, যা শিল্প খাত ও গৃহস্থালি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত শীতকালে বিশ্ববাজারে ও দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ে।

এলপিজি সংকট কাটাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অন্যান্য উদ্যোগ হলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণপ্রাপ্তির আবেদন ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া; আমদানির সিলিং বৃদ্ধির জন্য ওমেরা, মেঘনা, যমুনা, ইউনাইটেড আই গ্যাস ও ডেল্টা থেকে পাওয়া আবেদনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে বিইআরসিকে অনুরোধ; জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে যেকোনো কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রিসভা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত