মামলা ছাড়াই ৬০০ কোটি টাকা  আত্মসাতের অভিযোগ নিষ্পত্তি

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি এমন ভিত্তির ওপর অভিযোগটি নিষ্পত্তি করা হয়। দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশন অভিযোগটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে অভিযোগটি পুনরায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। অভিযোগটি পুনরায় অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গত ৬ জানুয়ারি দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করেছে কমিশন।

দুদকের তথ্যমতে, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারের ৬০০ কোটি হাতিয়েছে। ২০১৯ সালে এমন অভিযোগের অনুসন্ধানের নামে দুদক। সংস্থাটির তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশ প্রায় দুবছর অনুসন্ধান শেষে ২০২১ সালের জুনে সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা, বাপেক্স এবং গ্রানাইট খনির ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু কমিশন নানামুখী তদবিরের কারণে মামলার অনুমোদন না দিয়ে ‘কোয়ারি’ দিয়ে ফাইল ফেরত পাঠায়। এতে বলা হয়, চুক্তিগুলো গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। ‘শর্ট ফল’ কি চুক্তির মধ্যে আছে? বালির পরিমাণ কত ছিল চুক্তিতে? এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি রিপোর্ট আছে। অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জিজ্ঞাসা করতে হবে। তারপরই বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এরপর অনুসন্ধান কর্মকর্তা রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোয়ারির জবাবসহ পুনরায় মামলার সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানে বলা হয়, চুক্তিপত্রের শর্ত মোতাবেক পরিচালনা পর্ষদের ২০১৮ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সভায় চুক্তিতে উল্লিখিত পরিমাণের অতিরিক্ত ডাস্ট উৎপাদনের জন্য জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, কোয়ারির প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন সরবরাহের জন্য অনুরোধ করার পর বিদ্যুৎ, জ্বাালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে মধ্যপাড়া গ্রানাইট কোম্পানি লিমিটেডের ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগটি নিষ্পত্তি বলে গণ্য করা যেতে পারে।

জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের এই মতামতের ভিত্তিতে কমিশন মামলার অনুমোদন না দিয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে সরিয়ে উপপরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলামকে নতুন করে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। এরপর দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে অভিযোগটি পরিসমাপ্ত করা হয়। যদিও কমিশন দায় এড়াতে এ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়।

অভিযোগ রয়েছে, মামলার সুপারিশ করা প্রতিবেদন পরিবর্তন করে অভিযোগ পরিসমাপ্তির প্রতিবেদন তৈরিতে লেনদেন হয়েছে ১০ কোটি টাকা! দুদকের ঊর্ধ্বতনদের যোগসাজশে মোটা অঙ্কের এই অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্তদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ ঘটনায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় দুদকের ভেতরেই ‘দুর্নীতির ভূত’ আছে। সংস্কারের মাধ্যমে এই ভূত দূর করতে না পারলে দুদকের কাজে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগটি নতুন করে অনুসন্ধান করলে দুর্নীতির ঘটনায় খোদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেক রাঘববোয়াল ফেঁসে যাবেন। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নতুন করে অনুসন্ধান চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পরে গত ৬ জানুয়ারি কমিশন তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে। দুদকের উপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন অনুসন্ধান দলের অন্য দুই সদস্য হলেন উপপরিচালক আহসানুল কবীর পলাশ ও সহকারী পরিচালক খায়রুল বাসার। 

অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্তের বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি এটি জেনে পরে জানাতে পারবেন। 

তবে দুদকের একজন কর্মকর্তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পরিসমাপ্তির সময় দায়িত্বে ছিলেন দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন আব্দুল্লাহ, কমিশনার আছিয়া খাতুন ও কমিশনার জহুরুল হকসহ তাদের অনুগত কয়েকজন কর্মকর্তা। অনুসন্ধান পর্যায়ে এ ঘটনায় যাদেরই জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির সঙ্গে জিটিসির মাধ্যমে খনি পরিচালনা ও পাথর উত্তোলনের কাজ করা হয়। কিন্তু এ কাজে কোম্পানিটির অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে কঠিন শিলা উৎপাদনে ধস নামে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলন করার কথা। কিন্তু চুক্তি মেয়াদে কোম্পানিটি মাত্র ৩০ লাখ টন পাথর উত্তোলন করে। চুক্তি মেয়াদের দ্বিতীয় বছরেই কাজের দৈন্যদশা স্পষ্ট হয়। দ্বিতীয় বছর চুক্তির ১৪ লাখ টনের জায়গায় ৫ লাখ টন, তৃতীয় বছর ১৬ লাখ টনের বিপরীতে মাত্র ১ লাখ টন ও চতুর্থ বছর ১৭ লাখ টনের বিপরীতে ৪ লাখ টন পাথর উত্তোলন করে।

খনি কর্র্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চুক্তিবদ্ধ মেয়াদের মধ্যে এক বছর পাথর উত্তোলন বন্ধ ছিল। চুক্তি মেয়াদে নির্দিষ্ট পরিমাণ পাথর উত্তোলন করে না দেওয়ায় রাষ্ট্রের অন্তত ৬০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এরপরও রহস্যজনক কারণে কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি চুক্তির মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে খনিটি পরিচালনা ও পাথর উত্তোলনের দায়িত্ব পায় জিটিসি। কোম্পানিটির সঙ্গে সম্পাদিত এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার চুক্তি অনুযায়ী খনিতে ৬ বছরে ১২টি স্টোপ নির্মাণ করে সেখান থেকে ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলনের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু মাত্র ৩০ লাখ টন পাথর উত্তোলন করে চুক্তি মূল্যের এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার পুরোটাই সরকারের প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে হাতিয়ে নেয় জিটিসি। এই চুক্তিপত্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এ কারণে দুর্নীতির দায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন না বলে মনে করেন দুদক কর্মকর্তারা। অভিযোগের অনুসন্ধান করলে শেখ হাসিনাসহ অনেকেই ফেঁসে যেতে পারেন এমন আশঙ্কা থাকায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশনসহ দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা যোগসাজশ করে অভিযোগ অনুসন্ধানের পরিসমাপ্তি ঘটান। 

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যাদের আসামি করার সুপারিশ করা হয় তারা হলেন রাজধানীর ধানম-ি এলাকার সিরাজুল ইসলাম কাজী, পেট্রোবাংলার তৎকালীন পরিচালক (পিএসসি) মোহাম্মদ আবুল বাসার, অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আমিনুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক মো. মাহমুদ খান, বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মো. আব্দুল হান্নান, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক মো. আসাদুজ্জামান, উপমহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, উপমহাব্যবস্থাপক আতিয়ার রহমান, উপমহাব্যবস্থাপক সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, উপমহাব্যবস্থাপক মো. উবায়দুল্লাহ, উপমহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুল মাজেদ, মধ্যপাড়া গ্রানাইট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম কামরুজ্জামান ও ব্যবস্থাপক সুদীপ্ত পাল।

এ অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিশ্বাসযোগ্য সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকার পর যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশে দুদক অনুসন্ধান করে। সেখানে আরেকজন কর্মকর্তার পরিসমাপ্তির জন্য প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। তা ছাড়া যেখানে মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, সেখানে এই অভিযোগের অনুসন্ধান চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর যৌক্তিকতা নেই। প্রভাবশালীদের ছাড় দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত