মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, সে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেয়, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে, নাকি চিরস্থায়ী আখেরাতকে? পবিত্র কোরআনের একটি সংক্ষিপ্ত ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর সে দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়।’ (সুরা নাজিয়াত, আয়াত ৩৮) এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের আত্মিক পতনের ইতিহাস, তার ভুল পছন্দের বেদনাময় কাহিনি।
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, সে মূলত স্থায়ীত্বের বিনিময়ে ক্ষয়কে বেছে নেয়। সে এমন এক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে চিরস্থায়ী সুখ বিক্রি হয়ে যায় সাময়িক মোহের কাছে। সত্যের প্রবহমান নদী ছেড়ে সে ছুটে যায় মরুভূমির মরীচিকার পেছনে। যা দূর থেকে ঝলমলে, হাত বাড়ালেই মিলবে মনে হয়, অথচ কাছে গেলে সেখানে নেই কোনো পানি, নেই কোনো প্রশান্তি। সে নুর বা আলোকে ভুলে যায়, শুধু ঝিলিকের পেছনে ছুটে বেড়ায়।
দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে হলো ক্ষণিকের আলোকে অনন্ত সূর্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া। এর মানে হলো, এমন একটি ঝরে পড়া ফুলকে ভালোবাসা, যে কখনো বাগানের সুবাস চিনতে পারেনি। সে তাড়াহুড়ার লাভ বেছে নেয়, আর হারিয়ে ফেলে চিরস্থায়ী শান্তি। সামান্য আর অস্থায়ী ভোগের বিনিময়ে সে বিসর্জন দেয় সেই প্রশান্তিকে, যা মৃত্যুর পরও অপেক্ষা করে।
এই দুনিয়া নিজেকে সাজায় কনের মতো। তার অলংকারে চোখ ঝলসে যায়, বাহ্যিক সৌন্দর্যে মন মুগ্ধ হয়। কিন্তু দিন শেষে সেই দুনিয়া রেখে যায় শুধু ছাই। সেই ছাই তৃষ্ণা মেটাতে পারে না, ভবিষ্যতের জন্য কোনো আশা বপন করতে পারে না। দুনিয়ার মোহ হৃদয়ে জায়গা নিলে সেখানে ইমানের রঙ ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি মূলত মানুষের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। তখন মানুষ নিজের ডানা মাটিতে বেঁধে ফেলে, আকাশের দিকে উড়তে সাহস পায় না। সে মাটির দাস হতে রাজি হয়, অথচ ভুলে যায় যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে রুহ থেকে। ভুলে যায়, জীবন আসলে কয়েকটি নিঃশ্বাসের সমষ্টি। প্রতিটি নিঃশ্বাস তাকে অবধারিত বিদায়ের দিকে আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
উল্লিখিত আয়াত শুধু একটি চিত্রায়ণ নয়, এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। মহান আল্লাহ যেন বলে দেন, যা নশ্বর তাকে অগ্রাধিকার দিও না, যা অবিনশ্বর সেটিকেই বেছে নাও। দুনিয়া এক সংকুচিত ছায়া, সময় যত এগোয়, ছায়া তত ছোট হয়। আর আখেরাত হলো সেই আলো, যা কখনো নিভে যায় না। যে ব্যক্তি এই আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করে, সে দুনিয়াকে ত্যাগ করে না, বরং দুনিয়াকে তার যথাযথ জায়গায় রাখে। দুনিয়াকে লক্ষ্য নয়, পথ হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ সে জানে, প্রকৃত সফলতা এই জীবনের ঝলকে নয়, বরং সেই জীবনে, যেখানে কোনো শেষ নেই।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
