২২ বছরে শেষ হয়নি ১৩৫ দিন

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

সংবিধানে এবং ফৌজদারি আইনে দ্রুত বিচারের বিষয়ে অভিযোগের প্রমাণ সাপেক্ষে আসামিকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে জোরালো তাগিদ রয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে সব ফৌজদারি মামলাই গুরুত্ববহ। তবে এমন কিছু অপরাধ বা ঘটনা সমাজে ঘটে, যা ভীতি, অস্থিতিশীলতা সঞ্চার করে; জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ কারণে নির্দিষ্ট কিছু মামলাকে স্পর্শকাতর, গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর উল্লেখ করে দ্রুত বিচারের উদ্যোগ নেয় সরকার।

এ পরিপ্রেক্ষিতেই ২৩ বছর আগে ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২’ প্রণয়ন করে সরকার। এ আইন অনুযায়ী, সরকার বাদীপক্ষের আবেদনে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে খুন, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন, বিস্ফোরক ও মাদক মামলার মতো কতিপয় গুরুতর, স্পর্শকাতর ফৌজদারি মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়। আইনানুযায়ী, মামলা ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসে (বর্ধিত ৪৫ কার্যদিবসসহ মোট ১৩৫ কার্যদিবস) নিষ্পত্তি করার কথা রয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ওই আইনের প্রয়োগের দিকটি খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, হত্যা মামলার প্রায় ২৯ বছর এবং ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার শুরুর ২২ বছরেও বিচার শেষ হয়নি।

১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পিসি কালচার হাউজিং এলাকায় স্থানীয় যুবক জাহিদ আমিন হিমেলকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ছয়জনকে (ইতিমধ্যে এক আসামির মৃত্যু হয়েছে) অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। অভিযোগপত্রে ঢাকার তালিকাভুক্ত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আসে। ১৯৯৯ সালের ৭ অক্টোবর ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। তবে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০০৩ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ পাঠানো হয়। মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০২ সাল থেকে এ মামলার কার্যক্রমে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ ছিল। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল স্থগিতাদেশ বাতিল হলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২২ বছরেরও বেশি সময়ে ২৯ জন সাক্ষীর মাত্র ৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে ১১ মাস আগে। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য কয়েকটি তারিখ ধার্য করার পর সর্বশেষ তারিখ করা হয়েছে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি। এদিকে, সন্তান হত্যার বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা বাদী জাফরুন নাহারের ঠিকানায় সমন পাঠালেও তার খোঁজ মিলছে না বলে জানিয়েছেন আদালতের কর্মচারীরা।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচার নির্দিষ্ট সময়ে করার বিধান রয়েছে। বিচারকাজ ৯০ বা ১৩৫ কার্যদিবসে নিষ্পন্ন করার বিষয়ে গত দেড় দশকে অন্তত দুবার (২০০৮ ও ২০১৬) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, নির্ধারিত সময় বাধ্যতামূলক নয় বরং নির্দেশনামূলক। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত বিচারের জন্য জাতীয় সংসদ একটি আইন করেছে। কিন্তু ২২ বছরের বেশি সময় পরও বিচার শেষ হয়নি। তাহলে আইন করে লাভটা কী হলো? আইনের উদ্দেশ্যই তো আর থাকছে না।’ তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগ হয়তো পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু বিচার দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়ে না হওয়ার জন্য আপিল বিভাগের ওই সিদ্ধান্তকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়।’ মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরবর্তী সংসদ এর যৌক্তিক সমাধান দিতে পারে। আপিল বিভাগও সুয়োমোটো সিদ্ধান্ত দিতে পারে।’

দেশের নয়টি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের চারটি ঢাকায়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগে রয়েছে একটি করে ট্রাইব্যুনাল। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালগুলোতে ৮৫টি স্পর্শকাতর ও গুরুতর মামলা বিচারাধীন, যার ৫৮টিতে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। ৪৪টি মামলার বয়স পাঁচ বছর বা তার বেশি। বিচারাধীন মামলাগুলোর ৩১টি ঢাকার ৪টি ট্রাইব্যুনালে, ২৮টি চট্টগ্রামে, ৫টি রাজশাহীতে, ৯টি খুলনায়, ৫টি বরিশালে ও ৭টি সিলেটে।

আইনে যা আছে : দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪ ও ৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার। আসামিকে অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে মৃত্যুদ- বা যেকোনো সাজা দিতে পারবেন বিচারক। আইনের ১০ ধারার ভাষ্য, ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসে নিষ্পত্তি করতে হবে; তা না হলে আরও ৩০ কার্যদিবসে, না হলে আরও ১৫ কার্যদিবসে অর্থাৎ, মোট ১৩৫ কার্যদিবস সময় নিতে পারবে আদালত। তবে নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ সুপ্রিম কোর্টকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। আইন অনুযায়ী, ১৩৫ কার্যদিবসে বিচার নিষ্পত্তি না হলে মামলাটি যে আদালত থেকে এসেছিল, সেখানে ফেরত যাবে। সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারে দীর্ঘসূত্রতার অনেক নজির রয়েছে বলে জানা গেছে। গত এক দশকে ট্রাইব্যুনালে মামলা এসেছে অনেক কম।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১, ২, ৩ ও ৪-এ ৯০ দিন কিংবা বর্ধিত আরও ৪৫ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির নজির নেই। ট্রাইব্যুনালগুলোতে এক যুগ বা এর বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলাও রয়েছে । মামলাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারে ধীরগতির কয়েকটি কারণের দুটি হলো, আসামিপক্ষের আবেদনে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ এবং সাক্ষীর গরহাজিরা বা সাক্ষীকে তার ঠিকানায় না পাওয়া। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এর পিপি মো. বিল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের মামলায় স্থগিতাদেশ না ওঠা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ১৩৫ কার্যদিবসে মামলার নিষ্পত্তি না হলে (যেগুলোতে স্থগিতাদেশ নেই) আমরা ফেরত পাঠিয়ে দিই। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মামলার তদারকিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সেল থাকা সমীচীন বলে করি।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রসিকিউটরিয়াল উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন সাধারণ ফৌজদারি আদালতেও স্পর্শকাতর মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৯০ বা ১৩৫ কার্যদিবসে নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক।’ এটি জটিলতা বা অসংগতি কি না, এমন প্রশ্নে এই ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘উচ্চ আদালত স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দিলেই তো হয়ে যায়, কোনো জটিলতা দেখা দেয় না।’

একই পরিস্থিতি দ্রুত বিচারের আদালতে : প্রায় ২৩ বছর আগে ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২’ করে সরকার। ত্রাস সৃষ্টি ও জনমনে আতঙ্ক তৈরি করার অপরাধের দ্রুত বিচার করাই ছিল এ আইনের মূল উদ্দেশ্য। আইনটি নিয়ে দুই দশকের বেশি সময়ে সমালোচনাও হয়েছে ঢের। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে এ আইনে সংশোধনী এনে মেয়াদ না বাড়িয়ে স্থায়ী করা হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, দ্রুত বিচার আদালতে বিচার করবেন বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। আদালত আসামিকে সর্বনিম্ন দুই বছর ও সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদ-ের বিধানসহ অর্থদ- এবং বাদীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবে।

আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি হাতেনাতে পুলিশ বা অন্য ব্যক্তি কর্তৃক ধৃত হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল এবং অভিযোগপত্র পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকার্য করতে সম্পন্ন হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি হাতেনাতে ধরা না পড়লে অপরাধ সংঘটনের পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ দাখিল করতে হবে এবং অভিযোগ দায়েরের পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার সময় ধৃত না হয়ে অন্য কোনোভাবে ধৃত হলে বা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে অভিযোগ দাখিলের বা অভিযোগ পাওয়ার তারিখ হতে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হবে। তবে এ আইনে নির্ধারিত সময়ে বিচার নিষ্পত্তির নজির নেই বলে জানান ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালতের আইনজীবীরা। নির্দিষ্ট সময়ে বিচার নিষ্পত্তি না হলে কী হবে, তা আইনে স্পষ্ট নয়।

ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত-৩-এ বিচারাধীন একটি মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১২ সালের ৬ মে রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর সড়কের একটি ভবনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ২ লাখ টাকা চাঁদা চাইতে গিয়ে হাতেনাতে আটক ও গ্রেপ্তার হন ছয় ব্যক্তি। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৪ মে দ্রুত বিচার আইনে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। একই বছরের ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন হলেও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর। মামলার ১২ সাক্ষীর মধ্যে ৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। মামলাটির নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ৩০ কার্যদিবসে।

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন’-এ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৬০টির বেশি দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন ছিল ৩ হাজার ২৪৬টি মামলা। পাঁচ বছর বা বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ১৫০টি মামলা। ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত-৪-এর বিশেষ কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যত কথাই হোক না কেন, মামলা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বেড়াজালে আটকে আছে। সদিচ্ছা থাকলেও এ বিড়ম্বনা থেকে সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত