নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিরাত বা জীবনী পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআনের বাণীকে জীবনঘনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে সিরাত পাঠের বিকল্প নেই। কারণ তার জীবনই ছিল কোরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার প্রতিটি স্তরে সঠিক পথনির্দেশ পেতে সিরাত পাঠ খুবই জরুরি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নবীপ্রেম ও গবেষণার সম্মিলনে রচিত হয়েছে নবীজি (সা.)-এর জীবনীগ্রন্থ ‘সীরাতের অন্তরালে’। গ্রন্থটিতে নবীজি (সা.)-এর জীবনের নানা দিককে প্রশ্নোত্তরের আদলে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গ্রন্থটি রচনা করেছেন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও মিরপুর রূপনগর জামিয়া আশরাফিয়ার প্রিন্সিপাল মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। গ্রন্থটি লেখকের দীর্ঘদিনের নবীপ্রেম ও সাধনার ফসল। তিনি ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে ফাঁকে হাদিস ও সিরাত গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করে সংগৃহীত জ্ঞানকে প্রশ্নোত্তরের কাঠামোয় সাজিয়েনে। এতে নবীজির দৈহিক সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব, আখলাক, চিন্তা, চেতনা, সমাজ সংস্কারমূলক ভূমিকা এবং আদর্শিক অবস্থানের বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
লেখক সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিতে নবীজি (সা.)-এর বাহ্যিক অবয়বের বর্ণনা দিয়েছেন। এতে পাঠক মানসপটে নবীজিকে দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে তার অন্তর্গত গুণাবলি, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য, প্রজ্ঞা, সততা ও আল্লাহভীতির আলোচনা করে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি পরিপূর্ণ মানব চরিত্র গড়ে উঠেছিল।
গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো, সিরাত পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরা। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইসলামের প্রতিটি আমল গ্রহণযোগ্যতা পায় নবীজির সিরাত ও সুন্নাহর মানদণ্ডে। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সেই বিখ্যাত বক্তব্যের আলোকে নবীজির চরিত্রকে কোরআনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাঠক উপলব্ধি করতে পারবেন, কোরআন বোঝার সর্বোত্তম উপায় হলো নবীজির জীবনকে জানা।
এই গ্রন্থে জাহেলি সমাজে নবীজির অবস্থান এবং তার নৈতিক দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মূর্তিপূজক সমাজে জন্ম নিয়েও তিনি কীভাবে সব প্রকার শিরক ও অনৈতিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছিলেন, তা প্রামাণ্য বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। মদ্যপ সমাজে থেকেও মদ স্পর্শ না করা এবং অন্যায়ের ভিড়ে থেকেও ন্যায় ও পবিত্রতার ওপর অটল থেকেছেন তিনি, এসব বিষয় পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে নবীজির চিন্তাশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও দূরদর্শিতা তাকে মানবসমাজের প্রকৃত সমস্যাগুলো অনুধাবনে সহায়তা করেছিল।
এই গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নবীজির সিরাতের ভূমিকা। লেখক দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছেন জুলুম, নির্যাতন ও অশান্তিতে জর্জরিত পৃথিবীর জন্য নবীজির জীবনই একমাত্র কার্যকর আদর্শ। তার আগমনে মানবতা পেয়েছে মুক্তির পথ। কোরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিসের আলোকে প্রমাণ করা হয়েছে, নবীজির প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ছাড়া ইমানের পূর্ণতা সম্ভব নয়। এই আলোচনা পাঠককে নবীজির আদর্শ বাস্তব জীবনে প্রয়োগের তাগিদ সৃষ্টি করে।
গত ১ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) মিরপুর রূপনগর জামিয়া আশরাফিয়ার মিলনায়তনে সিরাতের অন্তরালে গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেওবুক ও কল্যাণপুর মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও শাইখুল হাদিস আল্লামা আবু তাহের জিহাদী। তিনি গ্রন্থটির জন্য লেখককে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, সিরাতচর্চা বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রয়োজন। বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদের খ্যাতনামা আলেম ও ইমাম-খতিবগণ। তাদের বক্তব্যে নবীজির সিরাতকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বাস্তবায়নের গুরুত্ব উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইসলামি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, ব্যাংকার ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ। তাদের উপস্থিতি ও আন্তরিকতায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। দোয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
‘সীরাতের অন্তরালে’ গ্রন্থটি নবীপ্রেম জাগ্রত করার একটি প্রয়াস। পাঠক যদি এই গ্রন্থের মাধ্যমে নবীজি (সা.)-এর জীবন থেকে সামান্য অংশও নিজের জীবনে ধারণ করতে পারেন, তবেই এর সার্থকতা। তার সিরাত পাঠ ও অনুসরণই পারে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সত্যিকারের শান্তির পথে পরিচালিত করতে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
