অসন্তুষ্টির মধ্যেই সমঝোতা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০১ এএম

অসন্তুষ্টি নিয়েই চূড়ান্ত হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের আসন-সমঝোতা। আজ অথবা আগামীকাল এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে। প্রতিটি আসনে একজন প্রার্থী রেখে বাকি সব প্রার্থী প্রত্যাহার করানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে দলগুলো। দু-এক দিনের মধ্যে জোটের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে।

জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও সমমনা দলের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, দেশের সব আসনে একক প্রার্থী ঠিক করতে দফায় দফায় বৈঠক করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। সমঝোতা চূড়ান্ত করতে গতকাল সোমবার রাতেও জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি দলের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। গত রবিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, আসন-সমঝোতায় কেউই শতভাগ খুশি হবেন না। স্বাভাবিকভাবেই অসন্তুষ্টি থাকবে। ছাড় দিয়ে কেউ নিজে খুশি হন না। তাই অসন্তুষ্টি নিয়েই আসন-সমঝোতা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সবাই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই কাজ করছেন।

গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আজ বা আগামীকালের মধ্যে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। জোটের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে সামনে আসার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান জামায়াত আমির।

জানা গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে ইসলামি ও সমমনা দলগুলো জোট বেঁধেছে। দফায় দফায় বৈঠকের পর নির্বাচনী নীতি চূড়ান্ত করেছে ইসলামি ও সমমনা দলগুলো। আট দলের নেতারা সারা দেশে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জোটের মূল শক্তি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে সংকট দেখা দেয়। উভয় দল প্রায় ২৭৫ আসনে নিজেদের প্রার্থী দেয়। যদিও এনসিপি, এবি পার্টি ও মাওলানা মামুনুল হকের আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তে মনোনয়নপত্র জমা দেননি।

সূত্রগুলো বলছে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যখন দূরত্ব বাড়তে থাকে, ঠিক সে সময় জোটে যুক্ত হয় আরও তিন দল। আট দল থেকে বেড়ে ১১-দলীয় জোট আসন- সমঝোতা নিয়ে আরও বেকায়দায় পড়ে। এমনকি জোট ভাঙারও খবর চাউর হয়। যদিও জোট ভাঙার আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেছে দলগুলো।

সমঝোতার আলোচনায় থাকা দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।

সূত্র বলছে, শুরুতে জামায়াত ২০০ আসন রেখে বাকি ১০০ আসন জোটের নেতাদের দেওয়ার চিন্তা করেছিল। শেষ পর্যন্ত সমঝোতার স্বার্থে নিজেদের জন্য ১৯৩ আসন রাখছে। ইসলামী আন্দোলন ৫০-এর কম-বেশি আসন নিয়ে আলোচনা করছে। জোট থেকে তাদের ৪৩ আসনে নির্বাচন করার কথা রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে এ সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩০ আসনে নির্বাচন করার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের দাবি ছিল ২০ থেকে ২৫টি আসন। জোটের পক্ষ থেকে ১৩ আসন দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৫টি আসনে নির্বাচন করতে পারেন দলটির প্রার্থীরা। খেলাফত মজলিস সাত আসন, এলডিপি ছয়টি এবং এবি পার্টির প্রার্থীরা দুই থেকে তিনটি আসনে নির্বাচন করবে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সক্ষমতার আলোকে আসন পাবে বলে জানিয়েছেন জোটের নেতারা। তবে এই তিন দল থেকে একজন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে জানা গেছে। আসনসংখ্যা কম-বেশি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তারা।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে কয়েকটি আসন নিয়ে সমঝোতা আটকে আছে। অনেক জায়গায় জামায়াত ছাড় দিলেও একই আসনে অন্য দুই দলের শীর্ষ দুজন নেতা রয়েছেন। সেখানে সমঝোতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হলে দু-তিনটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব এসেছে। রবিবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমঝোতার আলোচনা চলমান আছে। গতকাল রাতেও আলোচনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ঐকমত্য হলে দু-এক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসন-সমঝোতায় অগ্রগতি থাকলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সমঝোতা চূড়ান্ত হলে দু-এক দিনের মধ্যে ঘোষণা দেওয়া সম্ভব।’

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জোটের পক্ষ থেকে যাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে, ওই আসনে সব দলের নেতাকর্মীই তার পক্ষে কাজ করবেন। সব দলের জনশক্তি একসঙ্গে নামলে গণজোয়ার তৈরি হবে। ঘোষণার পর ৩০০ আসনের প্রার্থীই আমাদের সবার। সব দল সমঝোতার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। সবার সেক্রিফাইসকে আমরা বিজয়ে রূপান্তরিত করতে চাই।’

কোন দল কত আসন পাচ্ছে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

গত শনিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দু-এক দিনের মধ্যেই তার দল কয়টি আসন পাবে, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ : আসনছাড়ের ঘোষণায় দলগুলোর তৃণমূলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তীব্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অন্যের সমালোচনা করে পোস্ট দেখা গেছে।

সূত্রগুলো বলছে, সমঝোতার কারণে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী বাদ পড়ছেন এবং ভালো জনসমর্থন থাকা আসনও ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এই ছাড় কেন্দ্রীয় নেতারা মেনে নিলেও স্থানীয় নেতাকর্মীরা সহজে মানতে পারছেন না। এ নিয়ে অনেক এলাকায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের মহানগর পর্যায়ের (ঢাকার বাইরে) এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আসনে জামায়াতের রুকন সংখ্যাই আড়াই হাজারের বেশি। আমাদের আসনে জোয়ার তৈরি হয়েছে। এখন জোটের কারণে এ আসন ছেড়ে দিতে হচ্ছে শুনে সবাই মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু দলের স্বার্থে সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত