মানুষের জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে অমূল্য আমানত। এই জীবনের সুস্থতা, ভারসাম্য ও মর্যাদা রক্ষাই ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু এমন কিছু অভ্যাস ও প্রবণতা আছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের বিবেককে গ্রাস করে, চিন্তাশক্তিকে নষ্ট করে দেয় এবং তাকে মানবিক উচ্চতা থেকে নিচে নামিয়ে আনে। তেমনই এক সর্বনাশের নাম মাদক, যা ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। ইসলাম মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই মাদককে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং মানবিক জীবনব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার এক গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশনা।
মাদক মানুষের চারিত্রিক অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। আর মাদক মানবজাতিকে যতটা কঠিন আঘাত দিয়েছে, ততটা কঠিন আঘাত আর অন্য কোনো কিছু দিতে পারেনি। যদি এ ব্যাপারে ব্যাপক পরিসংখ্যান চালানো হয়, বিশ্বের হাসপাতালগুলোতে যে সমস্ত রোগাক্রান্ত মানুষ থাকে, তাদের মধ্যে কতজন মাদকের কারণে মস্তিষ্ক বিকৃত ও দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়, কতজন মাদকের কারণে আত্মহত্যা করে, অন্যকে খুন করে, বিশ্বের কতজনের ওপর এই মাদকের কারণে স্নায়ুবিক, পাকস্থলী ও নাড়িতান্ত্রিক রোগের অভিযোগ উঠে, তাহলে এর সংখ্যা দাঁড়াবে অনেক।
আরবরা জাহেলি যুগে মদ পানে প্রচণ্ড আসক্ত ছিল। মদের সঙ্গে ছিল তাদের গভীর বন্ধুত্ব ও অনুরক্ততা। তারা তাদের এ আসক্তি ও অনুরক্ততার কথা তাদের সাহিত্যের ভেতরেও প্রকাশ ঘটাত। এমনকি তারা মদের অনেক নামও দিয়েছিল। এর বিভিন্ন গুণাগুণ তাদের কবিতাগুলোতে উচ্চারিত হতো। বিভিন্ন আসরে আসরে বর্ণিত হতো এর রকমারি চমক।
যখন ইসলাম আবির্ভূত হলো, তখন ইসলাম মানুষদের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ পথে পরিচালিত করল। ইসলাম এসে তাদের ওপর মদকে হারাম করে দিল একটি ধারাবাহিকতা মেনে। তাদের প্রথম ধাপে মদ্যপ অবস্থায় নামাজ পড়া থেকে নিষেধ করা হলো। এরপর তাদের বলে দেওয়া হলো যে, মদের মধ্যে সামান্য যেসব উপকারিতা রয়েছে, তার তুলনায় এর গুনাহ ও অপরাধের দিকটিই অধিক মারাত্মক। এরপর আল্লাহতায়ালা আয়াত নাজিল করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কী তা থেকে বিরত হবে না?’ (সুরা মায়েদা ৯০-৯১)
মহান আল্লাহ এ দুই আয়াতে মদ ও জুয়াকে একেবারে চূড়ান্ত ও কঠোর ভাষায় হারাম করে দিয়েছেন। প্রথম আয়াতে ‘রিজসুন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যা শুধু অশ্লীল, জঘন্য, বীভৎস ও পঙ্কিল জাতীয় কিছু বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ ছাড়াও মদ ও জুয়াকে শয়তানের কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর শয়তানের কাজই হলো অশ্লীল ও বদ কাজ করা। এখানে মদপান ও জুয়াকে পরিহার করে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এই পরিহার করাকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে সাফল্যের পানে ধাবিত হওয়ার পথ। আরও বলা হয়েছে, এ দুই কাজের বিভিন্ন ক্ষতির কথা। বলা হয়েছে, এসব কাজ নামাজ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে, সৃষ্টি করে একে-অপরের মধ্যে শত্রুতা।
রাসুল (সা.) যখন সর্বপ্রথম মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেন, তখন তিনি এদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেননি যে, কোন কোন জিনিস থেকে মদ তৈরি করা হয়। বরং তার মূল দৃষ্টি ছিল মদ মানুষের মধ্যে যে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ঘটায়, সে দিকে। আর সেটা হলো মাতলামি। কাজেই যে জিনিসের মধ্যেই এই মাদকতা ও নেশা শক্তি বিদ্যমান থাকবে, সেটিই মাদক হিসেবে বিবেচিত হবে। চাই মানুষ সেটাকে যে নামেই অভিহিত করুক এবং যে জিনিস থেকেই তা প্রস্তুত করা হোক। সুতরাং ‘বিয়ার’ ও এ জাতীয় মাদকগুলোও হারাম। রাসুল (সা.)-এর কাছে মধু, ভুট্টা ও জব থেকে প্রস্তুতকৃত মদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই ‘খমর’ বা মাদক। আর প্রত্যেক খমরই হারাম।’ (সহিহ মুসলিম)
মাদকের মধ্যে গণ্য হয় এমন পানীয়ের পরিমাণ কম হোক বা বেশি হোক তা হারাম। হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে জিনিস অধিক পরিমাণে মাদকতা সৃষ্টি করে, তার সামান্য পরিমাণও হারাম।’ (আবু দাউদ)
ইসলাম মাদক ব্যবসাকেও হারাম করেছে। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য এ কাজ জায়েজ নয় যে, সে মাদক আমদানি-রপ্তানির কাজ করবে, মাদক ক্রয়-বিক্রয়ের দোকান দেবে কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের দোকানে কাজ করবে। রাসুল (সা.) মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দশ শ্রেণির ব্যক্তির ওপর অভিশাপ দিয়েছেন। তারা হলো, ‘যে মাদক উৎপাদন করে, যে তা উৎপাদন করিয়ে নেয়, যে তা সেবন করে, যে তা বহন করে, যার কাছে তা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, যে তা পরিবেশন করে, যে তা বিক্রি করে, যে তার মূল্য খায়, যে তা ক্রয় করে এবং যার জন্য তা ক্রয় করা হয়।’ (তিরমিজি)
সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে মাদক নির্মূল করার জন্য ইসলামি অনুশাসন প্রয়োজন। সুতরাং আমরা যদি ইসলামি অনুশাসন মেনে চলতে পারি তাহলে মাদক থেকে বাঁচতে পারব। আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা করুন। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মাদক ও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব জিনিস থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
মাদক মানুষের ইমান, চরিত্রের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। ব্যক্তি যখন মাদকে আসক্ত হয়, তখন সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়ে পরিবার। এতে বিপন্ন হয় সমাজ। ইসলাম তাই মাদকের প্রশ্নে কোনো আপস করেনি। কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় মাদক, মাদকাসক্তি এবং মাদকের সঙ্গে জড়িত সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এই নির্দেশনা মানা মানেই নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, পরিবারকে নিরাপদ রাখা এবং সমাজকে সুস্থ পথে পরিচালিত করা। আজকের প্রেক্ষাপটে মাদকবিরোধী সংগ্রামে ইসলামি অনুশাসনের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র যদি সম্মিলিতভাবে এই নির্দেশনার আলোকে এগিয়ে আসে, তবে মাদকের অন্ধকার থেকে মুক্ত একটি সুস্থ, সচেতন ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও মাদ্রাসাশিক্ষক
