ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে শেষ দিনের শুনানি গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী শনিবার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে সাংবিধানিক এ সংস্থাটি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শেষ দিনের শুনানি হয়। এতে অন্যান্য নির্বাচন কমিশনাররাও অংশ নেন। এদিন ৬৩ আপিলের শুনানি গ্রহণ করা হয়। এ সময় ২৩টি আবেদন মঞ্জুর করা হয়। পাশাপাশি দুই আপিল অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।
আপিল শুনানি শেষে সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই আপিল শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা চাই সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন হোক। তিনি বলেন, অনেকেই হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টি আমরা কীভাবে ছেড়ে দিয়েছি, তা আপনারা দেখেছেন। কারণ, আমরা চাই নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হোক। তবে আপনাদের (প্রার্থী ও সংশ্লিষ্টদের) সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, আমি আমার এবং আমার টিমের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করতে পারি, কোনো পক্ষপাতিত্ব করে আমরা কোনো জাজমেন্ট দিইনি। অনেক বিচার-বিবেচনা এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
শুনানিতে প্রার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রশংসা করে নাসির উদ্দিন বলেন, আপনারা কোয়ারি করেছেন, আমরা কোয়ারির জবাব দিয়েছি, আই এম অ্যামেজ টু সিই অ্যাট দিস। আমাদের আলেম-ওলামারা এটাকে বাহাস বলে। আপনাদের আমি আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই ইসির পক্ষ থেকে। আমি আশা করব, ভবিষ্যতেও আপনাদের কাছ থেকে এ ধরনের সহযোগিতা পাব।
ঋণখেলাপিদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ঋণখেলাপি হিসেবে যারা চিহ্নিত ছিলেন, তাদের অনেককে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আমাদের ছাড় দিতে হয়েছে। আইন তাদের পারমিট করেছে বলেই আমরা সিদ্ধান্ত দিয়েছি। তবে বিষয়টি আমরা সহজভাবে নিইনি।
শেষদিন চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন। তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপের অভিযোগে ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংক আপিল করেছিল। শুনানি শেষে এসব আপিল খারিজ করে ইসি। কমিশন জানায়, তিনি ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা ছিলেন এবং অন্য দুই ব্যাংকের ক্ষেত্রে জামিনদার হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে করা আপিল গ্রহণ করে তার মনোনয়ন বাতিল করে ইসি। একই আসনের জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিন এ আপিল করেন। উল্লেখ্য, এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছিলেন।
অন্যদিকে ঢাকা-৪ আসনের আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান আপিলে তার প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্রও বহাল রাখা হয়েছে।
টাঙ্গাইল-৪ আসনে লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়ন বাতিল চেয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. লিয়াকত আলী আপিল করেছিলেন। শুনানিতে ‘নিষিদ্ধ দলের নেতা’ যুক্তি তুলে ধরা হলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, দল নিষিদ্ধ হতে পারে, ব্যক্তি নয়। এরপর কমিশন তার মনোনয়ন বহাল রাখে।
এ ছাড়া ফেনী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে ইসি। এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা মিন্টুর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেও তার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে আপিল করেছিলেন একই আসনের জামায়াতের প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক।
জানা গেছে, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। এ-সংক্রান্ত টাকাও জমা দেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাইসংক্রান্ত আপিল শুনানিতে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৬৩টি আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। শুনানিতে ২৩টি আপিল মঞ্জুর করা হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে ২১টি এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে ২টি আপিল মঞ্জুর হয়েছে।
অন্যদিকে, ৩৫টি আপিল নামঞ্জুর করা হয়েছে। এদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে ১৮টি এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে ১৬টি আপিল নামঞ্জুর করা হয়েছে।
রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়নপত্র বাতিলাদেশ বহাল রাখার একটি আপিলও নামঞ্জুর হয়েছে। এ ছাড়া তিনটি আপিল আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং একজন আপিলকারী শুনানিতে অনুপস্থিত ছিলেন। কমিশন দুটি আপিল আবেদন অপেক্ষমাণ রেখেছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গতকাল পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল। শেষ দিনে পাবনা-১ আসনে ৭ এবং পাবনা-২ আসনে ৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
