বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করা, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার স্থাপন, কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এছাড়া দিনাজপুরে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দেন।
গতকাল ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও রংপুরে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত পৃথক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গকে পরিকল্পিতভাবে গরিব করে রাখা হয়েছে। এ অঞ্চলের সঙ্গে সৎমায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে ৫৪ বছর ধরে। অথচ এই উত্তরবঙ্গই দেশের খাদ্য ও পুষ্টির জোগান দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, পুরো উত্তরবঙ্গকে বাংলাদেশের গৌরবময় কৃষি রাজধানীতে পরিণত করা হবে। এ লক্ষ্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে, যাতে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা যায়। কৃষকদের সহজ শর্তে ও বিনাসুদে ঋণ দেওয়া হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ফসলের উৎপাদন তিনগুণ বাড়ানো হবে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং পচনের ভয়ে কম দামে বিক্রি রোধ করতে বিভিন্ন স্থানে হিমাগার ও সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে।
জামায়াত আমির বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান ঘটানো হবে, যাতে যুবকদের কর্মসন্ধানে ঢাকায় গিয়ে কষ্ট পেতে না হয়। জাপান, ভিয়েতনাম বা চীনের মতো প্রতিটি ঘরকে একেকটি শিল্প ইউনিটে পরিণত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যুবকদের বেকার ভাতা দেওয়ার পরিবর্তে সম্মানজনক কাজের ব্যবস্থা করা হবে। কারণ বেকার ভাতা মানে অপমানের চাবি। দক্ষ জনশক্তি গড়তে চাকরিতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত প্রশিক্ষণকালীন ছাত্র-ছাত্রীদের সরকারি কোষাগার থেকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
দেশের উন্নয়নে নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মা-বোনদের জন্য নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও কর্মস্থল নিশ্চিত করা হবে। যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে দেশ গড়ার কাজে অবদান রাখতে পারেন। সমাজে বিভাজন না করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। উত্তরবঙ্গের মানুষকে দয়ার পাত্র নয়, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক ও দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি উন্নয়নের প্রচলিত ধারা বদলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, এতদিন উন্নয়ন টেকনাফ থেকে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত পৌঁছাত না। এখন থেকে উন্নয়ন হবে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফের দিকে, যাতে সারা দেশে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। এ লক্ষ্যে নারী-পুরুষ উভয়কে সমানভাবে শক্তিশালী করা হবে।
উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ নদীগুলো আজ কঙ্কালসার হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এগুলোকে খুন করা হয়েছে। ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শুধু নদীর জীবনই নয়, মানুষের জীবনেও প্রাণ ফিরে আসবে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষকে আর রাজধানীমুখী হয়ে রাস্তায় প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য ৬৪ জেলাতেই মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। পঞ্চগড়েও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
দেশের সম্পদ পাচারকারীদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া ২৮ লাখ কোটি টাকা ফেরত আনা হবে। ভবিষ্যতে কাউকে চুরির সুযোগ দেওয়া হবে না। নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশন করা হবে এবং এ এলাকার মানুষ গ্যাস পাবে।
জামায়াত আমির পঞ্চগড় সমাবেশে ১ আসনের প্রার্থী সারজিস আলমকে শাপলা কলি এবং ২ আসনের প্রার্থী মো. সফিউল আলমকে (সফি উল্লাহ সুফি) প্রতীক তুলে দেন। এছাড়া দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) মো. মতিউর রহমান, দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) এ কে এম আফজালুল আনাম, দিনাজপুর-৩ (সদর) মো. মাইনুল আলম, দিনাজপুর-৪ (চিরিরবন্দর-খানসামা) মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন মোল্লা, দিনাজপুর-৫ (ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর) এনসিপির মো. আব্দুল আহাদ, দিনাজপুর-৬ (বিরামপুর-হাকিমপুর-নবাবগঞ্জ-ঘোড়াঘাট) আনোয়ারুল ইসলামসহ প্রার্থীদের নিজ নিজ প্রতীক তুলে দেন। ঠাকুরগাঁও-১ দেলোয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁও-২ মাওলানা আব্দুল হাকিম ও ঠাকুরগাঁও-৩ মিজানুর রহমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন। রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও আংশিক সিটি করপোরেশন) রায়হান সিরাজী, রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৩ (সদর ও সিটি করপোরেশন) মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৪ (পীরগাছা-মিঠাপুকুর) এনসিপির আখতার হোসেন, রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) গোলাম রব্বানী, রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) নুরুল আমীনকে প্রতীক তুলে দেন। এ সময় তাদের বিজয়ী করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান পঞ্চগড় থেকে উড়োজাহাজে দিনাজপুর যান। পরে সড়কপথে ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে যান। সমাবেশ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন। ছোট ছোট পথসভায় বক্তব্য রাখেন। সড়কে জটলা না সৃষ্টির জন্য নেতাকর্মী ও জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশগুলোতে নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। অতিথিরা পৌঁছানোর আগেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলিসহ জোটের প্রতীক নিয়ে নানা সেøাগান দেন।
জনসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ, রাকসু ভিপি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ প্রমুখ।
এ সময় দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতারা, এনসিপি, জাগপাসহ ১০ দলীয় জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আজ শনিবার জামায়াত আমির গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় জনসভা শেষে রাতে ঢাকায় ফিরবেন।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন দিনাজপুর প্রতিনিধি কুরবান আলী ও পঞ্চগড় প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম।
