অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কবলে থাকা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মধ্যে ছয় কোম্পানি অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি তিন কোম্পানিকে আর্থিক সূচকে উন্নতির জন্য আগামী ছয় মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বিষয়টি গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্রের দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
অবসায়নের আগে গত সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে দেওয়া কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করেই তিন প্রতিষ্ঠানকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা বোর্ড অনুমোদন করেছে।
জানা গেছে, দেশের আর্থিক খাতে বর্তমানে মোট ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছর মে মাসে ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সন্তোষজনক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা দিতে না পারায় একই বছর ৩০ নভেম্বর গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় নয়টি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। বন্ধের সিদ্ধান্তের পর থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর তলানিতে নেমেছে। সবশেষ চূড়ান্তভাবে বন্ধের তালিকায় থাকা ছয় কোম্পানির মধ্যে পাঁচটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত।
গতকাল বুধবার শেয়ারবাজারের লেনদেনে অংশগ্রহণ করা ওই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমায় দরপতন হয়েছে। বিপরীতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়া তিন কোম্পানির শেয়ারের দর বেড়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে না পারা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং মূলধন ঘাটতি সূচকে ভিত্তিতে নয়টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অন্যদিকে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকে (বিআইএফসি) আর্থিক অবস্থার উন্নতি বা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। সমস্যগ্রস্ত এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশের বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির ফলে এসব এনবিএফআই কার্যত ধ্বংসের মুখে পড়ে। আলোচিত পিকে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফাস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, অবসায়নের তালিকায় থাকা নয়টি রুগ্ন এনবিএফআইয়ের ব্যক্তি আমানতকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই তাদের মূল টাকা ফেরত পাবেন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মূল্যায়ন শুরু হবে। মূল্যায়নের পর শেয়ারহোল্ডাররা কোনো অর্থ পাবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে সরকার মৌখিকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। তবে আমানতকারীরা কেবল তাদের মূল অর্থ ফেরত পাবেন, কোনো সুদ দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সমস্যায় জর্জরিত ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি আমানত আটকে পড়েছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের।
এদিকে বন্ধের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গতকাল শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশগ্রহণ করা বন্ধের তালিকায় থাকা ফাস ফাইন্যান্সের শেয়ারদর ৮ পয়সা বা ১০ শতাংশ কমে ৬৯ পয়সায় এবং প্রিমিয়ার লিজিংয়ের দর ৭ পয়সা বা ১০ শতাংশ কমে ৬৩ পয়সায় নেমেছে। এছাড়া, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের দর ৮ পয়সা বা প্রায় ১০ শতাংশ কমে ৭৪ পয়সায়, পিপলস লিজিংয়ের দর ৮ পয়সা বা ১০ শতাংশ কমে ৬৯ পয়সায় এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের দর ৭ পয়সা বা প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ৬৬ পয়সায় নেমেছে। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানেই আজ সামান্য পরিমাণ শেয়ার হাতবদল হয়েছে। অর্থাৎ বড় দরপতন হওয়া সত্ত্বেও বন্ধ হওয়ার তালিকায় থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কিনতে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
অপরদিকে, জিএসপি ফাইন্যান্সের শেয়ারদর আজ ১০ পয়সা বা প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ১ টাকা ৯০ পয়সা বেড়েছে। এছাড়া, প্রাইম ফাইন্যান্সে ১০ পয়সা বা প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ১ টাকা ৪০ পয়সায় এবং বিআইএফসির শেয়ারদর ১০ পয়সা বা প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ১ টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছে। উল্লেখ্য, সার্কিট ব্রোকারের নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী, একদিনে কোনো শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি/পতন হতে পারে। আজ এই তিনটি কোম্পানির শেয়ারদর ৬, ৭, ৮ শতাংশ হারে বাড়লেও এটিই ছিলো সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমা।
