আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্বোধন করে লেখা এক খোলা চিঠিতে অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, এই নির্বাচন ও তার আগের সময়কাল অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার প্রতিশ্রুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তিনি উল্লেখ করেন, এখন নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। তাই সব নাগরিক যাতে ভয়মুক্ত, নিরাপদ ও অবাধে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন সেটি নিশ্চিত করে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় দেওয়ার এই সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকারকে কাজে লাগাতে হবে।
গত ২৬ জানুয়ারি লেখা এই চিঠি গতকাল বুধবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। চিঠিতে মানবাধিকার উন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গঠনমূলক সংলাপের অংশ হিসেবে নির্বাচনপূর্ব মৌলিক অধিকার সুরক্ষা নিয়ে সংস্থার উদ্বেগ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
মহাসচিব লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ সময়টি বড় দায়িত্বের পাশাপাশি জনআস্থা পুনরুদ্ধার, সুশাসন জোরদার এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করার এক অনন্য সুযোগ।’
চিঠিতে অতীত সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার মতো গুরুতর লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থবহ সংস্কার শুরুর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়।
সংস্থাটি স্বীকার করেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার গুম সুরক্ষা কনভেনশন এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকল (ওপিসিএটি) অনুসমর্থন করেছে। তবে কাঠামোগত পরিবর্তনে সময় লাগে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এখনো মানবাধিকার সুরক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
নির্বাচনের আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে অ্যামনেস্টি বলেছে, এসব অধিকারে বাধা দিলে নির্বাচনী পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনগণের আস্থা দুর্বল হয়।
চিঠিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী। উদাহরণ হিসেবে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না এবং আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শরিফ ওসমান হাদির হত্যার পর বিক্ষোভকারীদের সহিংসতা, দুটি সংবাদপত্রের অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, ছায়ানট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে হামলা, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরের হয়রানি এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, এসব ঘটনা মানবাধিকার সুরক্ষায় গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। এগুলো ২০২৫ সালে সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, সংখ্যালঘু ও শিল্পীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার অংশ। এসবের তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে হামলা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিলম্বিত বা অকার্যকর ভূমিকা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নমুনা।
অন্তর্বর্তী সরকারকে মানবাধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মহাসচিব বলেছেন, এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা, অধিকার প্রয়োগকারীদের সুরক্ষায় দ্রুত ও আইনসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া এবং গণমাধ্যমকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
