জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াত প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে অন্যতম নির্যাতিত মজলুম দল এই জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি করেনি। তা ছাড়া যারা গোলামির জিঞ্জির পরাতে চায়, তারাই শুধু না ভোটের কথা বলতে পারে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। গতকাল রবিবার শেরপুর ও জামালপুরে পৃথক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে দলের নেতারা হাসিমুখে ফাঁসির তক্তার ওপর দাঁড়াতে পারেন, তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। আমরা আপনাদের অনুনয়-বিনয় করছি, মায়ের গায়ে হাত উঠলে বাংলাদেশ বিস্ফোরিত হবে। মায়ের সন্তানরা গালে হাত দিয়ে বসে থাকবে না।’
বক্তব্যের শুরুতে জামায়াত আমির শহীদ কামরুজ্জামানকে স্মরণ করে বলেন, ‘এই মানুষটার লাশটিকেও তারা সহ্য করতে পারেনি। ভালোবাসা, জোর করে আদায় করা যায় না। মাত্র কয়েকদিন আগে তরতাজা শহীদ। প্রশাসনের ডাকে একটি মিটিং। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে একজন আলেমে দ্বীন, একজন শিক্ষক রেজাউল করিমকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অবশ্য যারা হত্যা করেছেন, তাদের জন্য এটি নতুন না। আমরা তো তাদের দলের না। নিজের দলের দুই শতাধিক মানুষকে যারা হত্যা করে ফেলেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে খুন করে ফেলে, এটি আবার কোন ধরনের রাজনীতি। সবচেয়ে মজলুম সংগঠনের নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এক এক করে সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় ঠান্ডা মাথায় ১১ জন শীর্ষ নেতাকে খুন করা হয়েছে। হাজারের ওপর সহকর্মীকে দুনিয়া থেকে বিনাবিচারে বিদায় করা হয়েছে। সাতশোর মতো সহকর্মীকে আয়নাঘরে বন্দি রাখা হয়েছে। তাদের আটজনের খবর-হদিস এখনো জানি না।’
শেরপুরে হত্যাকা-ের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপনাদের পাশের শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলায়Ñ কে সামনে-পেছনে বসবে এটি নিয়ে একজন মানুষকে খুন করে ফেলা হলো। আরও তিনজন হাসপাতালের বেডে জীবনমৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। তিন দিন হয়ে গেল, একজন আসামিও গ্রেপ্তার হয়নি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে এয়ারপোর্টে আমার সরাসরি দেখা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, অগ্রগতি কতদূর? তিনি বললেন সম্ভবত মামলা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে এই মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। তাহলে আমরা কার দিকে চেয়ে আছি।’ তিনি বলেন, ‘মায়েদের বিভিন্ন জায়গায় অপমানিত, অপদস্থ করা হচ্ছে। আপনারা নিজের পরিবারের মাকে, স্ত্রীকে সম্মান করতে শিখুন। আর যদি সম্মান করতে না জানেনÑ তাহলে আপনি মানুষ নামের কলঙ্ক। বহু জায়গায় মায়েদের গায়ে পর্যন্ত হাত দেওয়া হয়েছে।’
নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া ও অনাকাক্সিক্ষত পোস্ট বিষয়ে ডা. শফিক বলেন, ‘মায়েদের কী পরিমাণ সম্মান করি, তা বাংলাদেশের ৯ কোটি মা সাক্ষী। আমার একটা টুইটার যেটাকে এখন এক্স বলা হয়, অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এখন থেকে ১৫ ঘণ্টা আগে, অত্যন্ত বাজে, অরুচিকর, কুরুচিকর মন্তব্য দিয়ে দিছে মায়েদের নিয়ে। একটা দল দেখলাম হই হই রই রই করে মিছিল শুরু করে দিছে। যারা মায়েদের সম্মান করতে জানে না, তারা এখন মিছিল শুরু করে দিল। এই কাজ কে করেছে? ঠাকুর ঘরে কে-রে, আমি কলা খাইনি। কলা মুখে নিয়ে বলতেছে, আমি কলা খাইনি। কলা অর্ধেক খাওয়া অবস্থায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একেবারেই ইতরশ্রেণি না হলে এই কাজ করতে পারে না। আপনি আপনার কর্মসূচি আদর্শ দিয়ে আমাকে মোকাবিলা করুন। চোরাই পথে কেন?’Ñপ্রশ্ন রাখেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয় দেখানো হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও খুবই বৈষম্য করা হয়। এ সময় পুলিশ, সেনাবাহিনীর বেতন-বৈষম্যের উদাহরণ দেন তিনি।
শেরপুর জেলা আমির মাওলানা হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে এ সময় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ডক্টর সামিউল ফারুকী, শরপুর-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, শেরপুর-২ আসনের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া, শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল।
এর আগে শেরপুরে বিএনপির হামলায় নিহত জামায়াত নেতা রেজাউল করিমের কবর জিয়ারত করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরে এলাকাবাসী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমবেদনা জানান তিনি।
এদিকে, গতকাল জামালপুর পৌরশহরের কাচারিপাড়া এলাকায় সিংহজানী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু দল, তারা হ্যাঁ ভোটের ব্যাপারে স্বস্তির সঙ্গে কিছু বলতে চান না। আমরা তাদের কাছে বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাই, আমরা যেভাবে ১৮ কোটি মানুষের সামনে গিয়ে, সব জায়গায় সবাই বলছি। সংস্কারে হ্যাঁ ভোট, গণভোটে হ্যাঁ ভোট। আপনারা “হ্যাঁ” নাকি “না” সেটি ভালো করে বলেন। আস্তে আস্তে লুকিয়ে লুকিয়ে বলেন কেন? আমরা তাদের কাছে বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই। না। লুকিয়ে লুকিয়ে বলছে।’ তাদের তিনি প্রকাশ্যে কথা বলার আহ্বান জানান।
জেলা জামায়াতের আমির মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল আওয়ালের সঞ্চালনায় জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সাংগঠনিক সেক্রেটারি ড. ছামিউল হক ফারুকী, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব লুৎফর রহমান, ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ, সদর-৫ আসনের এমপি প্রার্থীসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা-উপজেলা জামায়াত নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন।
জামায়াত আমির চট্টগ্রাম যাচ্ছেন আজ : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নির্বাচনী সফরে আজ সোমবার চট্টগ্রাম আসছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এদিন চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় তিনটি জনসভায় বক্তব্য রাখবেন তিনি।
দলীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ১৬ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীদের নিয়ে মহানগরী, উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় পৃথক তিনটি জনসভা করবেন জামায়াতের আমির। এর মধ্যে বেলা ১১টায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের আসনগুলোর প্রার্থীদের নিয়ে লোহাগাড়া পদুয়া এসিএম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে, উত্তর চট্টগ্রামের আসনের প্রার্থীদের নিয়ে দুপুর ২টায় সীতাকু- সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ এবং মহানগরীর আসনের প্রার্থীদের নিয়ে বিকেল পৌনে ৫টায় চট্টগ্রাম বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ছাড়াও ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’-এর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
