ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার দুই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫ বছর করে ১০ বছর, শেখ রেহানার মেয়ে ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের ৪ বছর, এক মামলায় আজমিনা সিদ্দিকের ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি দুটি মামলার প্রত্যেকটিতে তাদের ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক রবিউল আলমের আদালত এ দুই মামলায় রায় ঘোষণা করেন। আসামিরা পলাতক থাকায় আইনের বিধান অনুযায়ী, তাদের অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করে আদালত। আদালত রায়ে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ হাসিনার ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, ভাগ্নি আজমিনা হক সিদ্দিক রূপন্তীর প্লট বরাদ্দ বাতিল করতে রাজউককে নির্দেশ দেয়।
পূর্বাচলের প্লট দুর্নীতির পৃথক ছয় মামলায় শেখ হাসিনাকে ৩৬ বছরের কারাদ- দিয়েছে আদালত। গতকাল দুই মামলায় ১০ বছর কারাদন্ড ছাড়াও গত বছর ২৭ নভেম্বর তিন মামলায় ৭ বছর করে ২১ বছর, ১ ডিসেম্বর এক মামলায় ৫ বছর কারাদন্ড হয় শেখ হাসিনার।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা, তার ছেলেমেয়ে, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও তার ছেলেমেয়ে সবাই ফৌজদারি মামলায় দন্ডিত হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। অভ্যুত্থান দমনে ব্যাপক হত্যাকান্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছর ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া আদালত অবমাননার অভিযোগে একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদন্ড দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল প্লট বরাদ্দ নিয়ে দুই মামলায় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনসহ ১২ জনকে ৫ বছর করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। একজনকে এক বছর করে দুই বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। ১০ বছরের দন্ডপ্রাপ্ত ১২ জন হলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), সাবেক সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) ফারিয়া সুলতানা, সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মাজহারুল ইসলাম এবং সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) নায়েব আলী শরীফ। দন্ডপ্রাপ্ত সবাইকে এক লাখ টাকা জরিমানা ব্যর্থতায় আরও ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
এসব মামলায় একমাত্র আসামি কারাগারে আটক থাকা মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে (সাবেক সদস্য এস্টেট ও ভূমি) এক বছর করে দুই বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। গতকাল তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে সাজা পরোয়ানাসহ তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। শেখ হাসিনাসহ অন্য সব আসামি পলাতক। আদালত সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে শেখ রেহানার সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীর নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লট বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে গত বছর ১৩ জানুয়ারি আজমিনা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া। ওই মামলায় টিউলিপ ও শেখ হাসিনাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। অন্যদিকে, একই দিনে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে দ্বিতীয় মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক এসএম রাশেদুল হাসান। এ মামলায়ও শেখ হাসিনা ও টিউলিপসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা শহরের বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকার তথ্য গোপন করে পরস্পর যোগসাজশে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রাস্তায় ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। শেখ হাসিনা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করেছেন এবং প্রচলিত আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এ প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন। সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ক্ষমতার অপব্যবহার করেন।
