চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার উত্তর কাট্টলী এলাকায় ১৯৮৬ সালে বন আইনের ৪ ধারায় নোটিফাইড করা ১৯৪ একর বনভূমিতে গড়ে তোলা ‘ডিসি পার্ক’-এর সেই জায়গা ফেরত চেয়েছে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগ। ২০২৩ সালের জুন মাসে রাস্তা তৈরির জন্য বনের পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলা হয় এবং বনের জায়গা জোরপূর্বক দখল করে ‘ডিসি পার্ক’ গড়ে তোলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। আলোচ্য ভূমি ফেরত চেয়ে গত বছর ২ জানুয়ারি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে প্রধান বন সংরক্ষক চিঠি দিলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পাখির অভয়ারণ্য তৈরির জন্য বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলা হয়েছে। আর এ কাজটি করেছেন চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। বন বিভাগ সে সময় তাকে আপত্তি জানালেও, তিনি তা আমলে নেননি।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এমএ হাসান বলেন, ‘ওই বনটি ১৯৯১ সালে বন বিভাগের সৃজিত বন এবং ১৯৮৫ সালে গেজেট দেওয়ার মাধ্যমে এটাকে ৪ ধারায় নোটিফাইড করা হয়েছে। সেখানকার মোট ১২টি কেওড়াগাছ ও প্রায় ৫ হাজার বাইনগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আমরা জায়গাটি ফেরত চেয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা দেখছি না।’
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্জার (সদর) মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল রিভিশন ফর লিভ টু আপিল মামলা নং ১৪৫৭/২০০৯ ও ১৪৫৮/২০০৯-এর ৬ অক্টোবর ২০১৩ সালের রায়ে বন আইনের ৪ ধারায় নোটিফাইড বনভূমি সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া আছে। বিষয়টি সাবেক জেলা প্রশাসক এবিএম ফখরুজ্জামানকে অবহিত করা হলেও, তিনি সে সময় বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন।’
বন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গেজেটভুক্ত বনভূমিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন যে ডিসি পার্ক গড়ে তুলেছে, তা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে করা হয়নি। সরকারি সংরক্ষিত বনভূমির মূল্যবান গাছ কেটে এবং উপকূলীয় সবুজ প্রতিরক্ষা ব্যূহ বিনষ্ট করে ডিসি পার্ক নির্মাণের বিষয়ে বন বিভাগকেও অবগত করেননি সাবেক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক এবিএম ফখরুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিমত দেন, বন আইনের ৪ ধারায় বিজ্ঞপ্তিভুক্ত ভূমি জেলা প্রশাসকের ১ নম্বর খাস রেকর্ডভুক্ত থাকলেও ৪ ধারা জারির পর আর সেই ভূমি খাস বলে অভিহিত করা যাবে না। তাছাড়া ভূমিটি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হলেও পার্ক পরিচালনা জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারবহির্ভূত। রাষ্ট্রের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী কোনো ধরনের পার্ক নির্মাণ, পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা জেলা প্রশাসনের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান আরও বলেন, ‘সাগরপাড়ের চরে ১৯৯১ সালে বন বিভাগ ম্যানগ্রোভ বন সৃজন করেছিল। উপকূলীয় এলাকায় সৃজিত বনের মালিকানা বন বিভাগের। কিন্তু আমাদের না জানিয়ে জেলা প্রশাসন উপকূলীয় বন কেটে ফেলে। বিষয়টি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছর ২ জানুয়ারি তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে একটি প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের আওতাধীন সদর রেঞ্জের কাট্টলী বিটের ভূমি বন, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ১ এফওআর.১৫৩/৭৪/৩৩৫, তারিখ ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৪ সাল মূলে ১৯২৭ সালের বন আইনের ৪ ধারায় সংরক্ষিত বন ঘোষণার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), চট্টগ্রামকে ফরেস্ট সেটেলমেন্ট অফিসার নিয়োগ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আরএস দাগের ভূমি বনায়নের জন্য বন বিভাগকে প্রদান করা হয়। পরে ভূমি প্রশাসন, স্বায়ত্তশাসন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ভূমি প্রশাসন, ভূমি সংস্কার বিভাগের স্মারক নং ৩৪৪(৪) ৫-১৩৬/৭৬ এলএস তারিখ ১৩-০৮-১৯৭৬ সাল মূলে উপকূলীয় বন বিভাগ, চট্টগ্রামের অনুকূলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ১ লাখ ৯৫ হাজার চর ভূমি বনায়নের জন্য তৎকালীন বন ও মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে স্মারক আই/এফও আর-৮৩-৭৫/৫৩৯ তারিখ-২৪ মার্চ ১৯৭৭ মূলে চূড়ান্তভাবে হস্তান্তরের নোটিফিকেশন জারি হয়, যা ১৯৭৭ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। ওই নোটিফিকেশনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন কৃষি মন্ত্রণালয় ১৯৮৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ১ লাখ ৬৫ হাজার একর বনভূমি বন আইন, ১৯২৭-এর ২০ ধারায় সংরক্ষিত বন ঘোষণার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) সেটেলমেন্ট অফিসার নিয়োগ করে বন আইনের ৪ ধারায় বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়, যা ১৯৮৬ সালের ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্র্তৃক ওই বনে রাস্তা নির্মাণের জন্য মূল্যবান শত শত গাছ কাটার খবর পেয়ে ২০২৩ সালের ৫ জুন ঘটনাস্থলে যান বন কর্মকর্তারা। সেখানে তারা দেখেন এক্সকাভেটর দিয়ে বাগান এলাকায় রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। রোপণ করা কেওড়াগাছ কর্তনসহ গোড়া উপড়ে ফেলা হচ্ছে। বনে রোপিত ও প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গেওয়া, বাইন, ছৈলাগাছ মাটির নিচে চাপা পড়ছে। এ সময় এক্সকাভেটর চালককে কাজ বন্ধ করার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আমি আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের (সাবেক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক) নির্দেশে কাজ হচ্ছে।’ পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা গিয়ে রাস্তা নির্মাণ ও গাছ কাটার কাজ বন্ধ করে দেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রায় ১২০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫০ ফুট প্রস্থের বন কেটে ফেলা হয়েছে রাস্তা নির্মাণের জন্য। কাটা হয়েছে মাটিও। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে পাখির অভয়ারণ্য ও ওয়াচ টাওয়ার। ডিসি পার্কে ছুটির দিনে ঘুরতে যান পর্যটকরা। কিন্তু রাস্তা তৈরির জন্য বনের যে গাছগুলো কাটা হয়েছে, সেখানে পর্যটকদের যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, রাস্তার জন্য কাটা বনে পাখির অভয়ারণ্য বা ওয়াচ টাওয়ার এখনো গড়ে ওঠেনি।
বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং সাবেক জেলা প্রশাসক এবিএম ফখরুজ্জামানের মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও তারা সাড়া দেননি। তবে এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দীন দাবি করেন, ‘ডিসি পার্কে ইতিমধ্যেই একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে লাগানো হয়েছে হাজার হাজার ফলদ, বনজ গাছ। আরও গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
