অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৭ মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি হতাশাজনক বলে মনে করে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির মতে, বর্তমান সরকারের কাছে পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের প্রত্যাশা থাকলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পূর্বের ধারার সঙ্গে নতুন কিছু ধারা যুক্ত হয়েছে। এইচআরএসএস ত্রয়োদশ নির্বাচনীপূর্ব সহিংসতা পর্যালোচনা করে বলছে, রাজনৈতিক হত্যাকা-, সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুড় ও নারীদের নিপীড়নের ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলেছে।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিস কেন্দ্র গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলেছে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির মাঠ ও নির্বাচন ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠেছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী-সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাকনির্বাচনী সহিংসতা প্রতিবেদন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এইচআরএসএস। এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাস (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) সময়কালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
লিখিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুড় ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে দলীয় ও অন্তঃকোন্দলের জেরে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। এতে জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। পাশাপাশি নারীদের ওপর হামলা ও রাজনৈতিক হত্যাকা-ের মতো ঘটনাগুলো নির্বাচনী পরিবেশকে করে তোলেছে কণ্টকাকীর্ণ। এ ছাড়া ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত অভিযোগ ও আইনি জটিলতা সত্ত্বেও প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এতে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ১৬২ সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ৯৭০ জন আহত হয়েছেন। ১৬২ ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলের ৪০টি ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৫৬০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৫০টি সংঘর্ষের ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৫৬০ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সংখ্যা কম থাকলেও নির্বাচনী প্রচারে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে, প্রচার- প্রচারণাকে কেন্দ্র করে নারী সহিংসতা, হামলা, হেনস্তা ও লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ১৮ নারী হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে এই সময় গুমের ঘটনা না ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, সীমান্ত হত্যা, মাজারে হামলা ও ভাঙচুড়, সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়ন বেড়েছে। এতে বলা হয়, মানবাধিকার উন্নয়নে বর্তমান সরকার কিছু পদক্ষেপ ও অধ্যাদেশ করলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১২১ জন বিএনপির। আহত হয়েছেন অন্তত ১১ হাজার ২২৯ জন। এসব সহিংসতার ‘মব সন্ত্রাস’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ১৭ মাসে সাংবাদিক নিপীড়নের বিষয়ে বলা হয়, ৪২৭টি হামলায় ৮৩৪ সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৬ জন সাংবাদিককে।
এইচআরএসএসের উপদেষ্টা নুর খান লিটন বলেন, ‘দেশের মানুষ নির্বাচনের বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। মানুষের মধ্যে শঙ্কা এখনো কাটেনি। নির্বাচনে সহিংসতা হবে নাÑ এ ধরনের পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি আমরা এমন দেখতে চেয়েছিলাম যেখানে মানুষের প্রত্যাশিত জীবনমান ও নিরাপত্তা থাকবে। গুমের ঘটনা হয়তো ঘটছে না। কিন্তু কাক্সিক্ষত সেই পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাইনি। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এখনো ব্যাপকভাবে বহমান রয়েছে। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি কিন্তু নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. মনিরুজ্জামান প্রমুখ।
ক্রমশ সহিংস নির্বাচন : আসক
নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে আসকের পর্যালোচনায় বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বর ও গত জানুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতার ৯৬টি ঘটনায় এতে ১৫ জন নিহত ও ৮৮৪ জন আহত হয়েছেন। তথ্য বিশ্লেষণ করে আসক বলছে, জানুয়ারির প্রথম ১০ দিন রাজনৈতিক সহিংসতার ৮টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। পরের ১০ দিন ১৮টি সহিংসতার ঘটনায় ২ জন নিহত ও ১৭৬ জন আহত হয়েছেন। আর জানুয়ারির শেষ ১০ দিন ৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ৪১৪ জন আহত হয়েছেন। আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে ১১ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। গত জানুয়ারিতে ১৬ জন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। বিবৃতিতে আসক উদ্বেগ জানিয়ে বলে, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির মাঠ ও নির্বাচন ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক আক্রান্তের হারও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সহনশীলতা ও সংযম প্রদর্শন এবং যেকোনো পরিস্থিতি যা সহিংসতার জন্ম দিতে পারে তা এড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আসক।
