ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জোটের অগ্রাধিকার খাতগুলো কিছুটা আলাদা হলেও ভোটে বিজয়ী হওয়ার মূল কৌশল দুই দলেরই এক ও অভিন্ন। দলীয় বা জোটভুক্ত দলের ভোটের চেয়েও আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের কাছে এখন বড় ফ্যাক্টর।
দুই দল এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ও তাদের সঙ্গীয় জোট মুখিয়ে আছে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে। জামায়াত ও তাদের সঙ্গে থাকা জোটও বিজয়ী হতে নজর রাখছে আওয়ামী লীগের ভোটের দিকে। বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের বড়সংখ্যক ভোটব্যাংক আছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ এই দলটি যেহেতু নির্বাচনের বাইরে রয়েছে, ফলে তাদের ভোটব্যাংকের কিছু অংশ সব দলই প্রত্যাশা করছে। তাদের মতে, এই ভোটগুলো টানতে পারলে আরও যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তা হলো আসন্ন নির্বাচনে ভোটে অংশগ্রহণের হারও হতাশাজনক হবে না।
বিএনপি মূলত রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভোটারদের নজর কাড়তে চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জামায়াতের অগ্রাধিকার নিরাপদ বাংলাদেশ গড়া। তবে দুই দলই নির্বাচনী প্রচারে অন্যতম কৌশল নির্ধারণ করেছে আওয়ামী লীগের ভোট যত বেশি বাগে আনা যায়। এ কৌশলের অংশ হিসেবে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে এমন কোনো আশ্বাস নেই, যা বিএনপি-জামায়াত দিচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের আগামী পাঁচ বছর নিরাপদে, শান্তিতে বসবাস করার নিশ্চয়তা দিচ্ছে তারা। এ নিশ্চয়তায় কাজ না হলে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে।
যদিও বিএনপি-জামায়াতের এই কৌশলকে বাঁকা চোখে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা দাবি করেন, আওয়ামী লীগের ভোট টানতে যে কৌশল বেছে নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত, সেটি আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নিরেট আদর্শহীন রাজনীতি। ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি ও বুর্জোয়া রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক। আদর্শবাদী রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি থাকলে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে এভাবে উঠেপড়ে লাগত না।
তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটাই ভোটের প্রতিযোগিতা। ভোটের কৌশল। তবে বিএনপি-জামায়াত যা করছে, তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে। যেটা আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্্ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া ও বুর্জোয়া রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক। এগুলো সুবিধাবাদী রাজনীতি। এ ধরনের রাজনীতি আদর্শবাদী রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের ক্ষমতাকাঠামো ও রাজনীতি যতদিন থাকবে, সুবিধাবাদী রাজনীতিও থাকবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ভোটে কিছু কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। বিএনপিও এর বাইরে নয়। তিনি বলেন, বিএনপি কোনো দলের ভোট টানছে বিষয়টা এভাবে দেখলে হবে না। আমরা ভোটার হিসেবেই সবাইকে মূল্যায়ন করি।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আওয়ামী লীগের ভোটার টানার কৌশল প্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে এটাকে আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না। তবে নির্বাচনে জিততে নানা কৌশল নিতে হয়, সে ক্ষেত্রে হয়তো কোথাও কোথাও হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত দুই দলই এটা করছে।’
ভোটের কৌশলে আওয়ামী লীগকে জামায়াতও রেখেছে, এটা দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা স্বীকার করলেও প্রকাশ্যে তারা এ ব্যাপারে কথা বলতে চান না।
বিএনপির অগ্রাধিকার খাতে দলটি ঘোষিত ৩১ দফাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেখানে তরুণ ভোটারের আকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আজ শুক্রবার ইশতেহার ঘোষণা করবে দলটি। ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ডসহ জনমুখী সেবা চালু করার ব্যাপারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ প্রতিশ্রুতি রয়েছে অগ্রাধিকারের তালিকায়। ১৮-৩৩ বছর বয়সী তরুণদের কর্মসংস্থান, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন ও বেকার ভাতা প্রদানে অগ্রাধিকার থাকছে বিএনপির। নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার খাতকে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রাজনৈতিক অঙ্গীকার তরুণ ও যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করছে। অগ্রাধিকারে নতুনত্ব যোগ করেছে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও নিরাপত্তা সেল। সংখ্যালঘু উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা। অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে নারী নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও নারী উদ্যোক্তা তহবিল। মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি ও নারী সহিংসতায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গঠনের পরিকল্পনা, তারেক রহমানের ঘোষিত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ এটির অংশ বলে দলের অনেক নেতাই দাবি করছেন।
এদিকে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সেখানে ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের’ স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীদের রাখা এবং রাজনৈতিক দলকে সরকারের তরফে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। জামায়াতের ঘোষিত এ অগ্রাধিকার খাত মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ‘নারীবিদ্বেষী’ পোস্ট সামনে আসা এবং নারীদের দলের প্রধান করার সুযোগ নেই বলে দলের প্রধানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মধ্যে ইশতেহারে বেশিসংখ্যক নারীকে মন্ত্রিসভায় রাখার কথা বলেছে দলটি।
ইশতেহারের ‘শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার’ শীর্ষক অংশে বলা হয় ‘নারীদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হবে’। যদিও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি জামায়াত। নারী, শিশু ও পরিবারের উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিতে দলটি বলেছে, পরিবার কাউন্সেলিং ও মোটিভেশন সেন্টার চালু করা, নিরাপদ বিদ্যালয় কর্মসূচি ও মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অনুদান ও সেবার পরিসর বাড়ানো।
‘রাজনীতি আমূল পরিবর্তনের’ প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে (আসন ও ভোটের সংখ্যানুপাতে) রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
নির্বাচনে জিতলে কার্যকর জাতীয় সংসদ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছে জামায়াত। দলটি বলছে, তাদের ভিশন হবে সংসদকে দেশ গঠন, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করা।
অগ্রাধিকার খাতে জামায়াত আরও বলেছে, নির্বাচনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে দলটি প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত সংস্কার করবে। প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট, এনআইডি ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিশ্রুতিতে দলটি ‘দুর্নীতিবাজদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে’। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রতিশ্রুতিতে জামায়াতের এক নম্বর অগ্রাধিকার বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানো। পাশাপাশি ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
তবে বেশ আলোচনায় উঠে এসেছে ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই-বিপ্লব পর্বে প্রতিশ্রুতিতে জামায়াতের অগ্রাধিকারের অঙ্গীকার। এতে জামায়াত বলেছে, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হবে। দলটি বলছে, ‘শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হবে।’