মানুষের অন্তরের অদৃশ্য ব্যাধিগুলোর মধ্যে বিদ্বেষ অন্যতম ভয়ংকর। অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন ক্ষোভ বিদ্বেষে রূপ নেয়, আর কখন সেই বিদ্বেষ নেক আমল ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখতে চায়। তাই বিদ্বেষের পরিণতি সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে, যেন মানুষ সময় থাকতে নিজেকে সংশোধন করতে পারে। হিংসা যেমন চুলার আগুনের মতো নেক আমল পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়, বিদ্বেষও আড়াল হয়ে দাঁড়ায় নেক আমলের সামনে। বিদ্বেষের ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি হাদিস থেকে কিছুটা ধারণা করতে পারি।
নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘শাবানের রাতে (শবেবরাতে) মহান আল্লাহ তার সব সৃষ্টিকেই ক্ষমা করে দেন। তবে তিনি মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করেন না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৩৯০) এই হাদিসে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। এক. মহান আল্লাহ শবেবরাতে যখন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, তার সব সৃষ্টিই যখন ক্ষমা লাভে ধন্য হয়, তখনো বিদ্বেষ পোষণকারী কেউ এ ক্ষমা পাবে না। দুই. বিদ্বেষকারীকে এ হাদিসে মুশরিকদের সহযাত্রী উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মুশরিককে যেমন ওই রাতে ক্ষমা করা হয় না, তেমনি বিদ্বেষকারীকেও ক্ষমা করা হয় না।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্বেষের মূলে থাকে ক্রোধ ও ক্ষোভ। কেউ কাউকে কষ্ট দিলে যদি সঙ্গে সঙ্গে সে ওই কষ্টের প্রতিবিধান করতে পারে, প্রতিশোধ নিয়ে নিতে পারে, তাহলে মনে আর ক্রোধ, ক্ষোভ থাকে না। কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যদি কেউ কোনো কারণে প্রতিশোধ নিতে না পারে, তা হলে অন্যায়কারীর প্রতি তার মনে জন্ম নেয় ক্রোধ ও ক্ষোভ। হতে পারে সে বয়সে অনেক বড়, কিংবা তার ক্ষমতা অনেক বেশি, অথবা সমাজের চোখে সে এতটাই মর্যাদাবান যে, আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার কিছুই করতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে কারও কাছে বিচারও প্রার্থনা করা যায় না। এভাবে যখন মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়, আর এ ক্ষোভ নিরসনের কোনো পথ সামনে না থাকে, তখনই ক্ষোভ আস্তে আস্তে বিদ্বেষে রূপ নেয়।
নিজে প্রতিশোধ নিতে না পারায় এখন প্রতিপক্ষের ক্ষতি কামনা করে। পাশাপাশি এ অপেক্ষায় থাকে, যদি কোনো সময় সুযোগ হয়, আমি দেখে নেব! এভাবে বিদ্বেষের কালো মেঘ যখন মনে জমাট বাঁধতে থাকে দিনের পর দিন, এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা পেরিয়ে প্রতিশোধের সুযোগ হাতে আসে, তখন সীমা ছাড়িয়ে এভাবে জালেম হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। তাই আমাদের কর্তব্য হলো, বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকা। কেউ আমাদের আমাদের ওপর জুলুম করলে ন্যায়বিচার কামনা করা, অন্যথায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াবের আশায় তাকে ক্ষমা করে দেওয়া।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘মন্দের বদলা অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধনের চেষ্টা করে তার সওয়াব আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি জালেমদের পছন্দ করেন না। যারা নিজেদের ওপর জলুম হওয়ার পর বদলা নেয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ তো তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর জুলুম করে ও পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। এরূপ লোকদের জন্য আছে যন্ত্রণাময় শাস্তি। আর প্রকৃতপক্ষে যে ধৈর্যধারণ ও ক্ষমা প্রদর্শন করে, এটা বড় হিম্মতের কাজ। (সুরা শুরা ৪০-৪৩) মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও সাংবাদিক
