চলতি বছর নিপাহ ভাইরাসে দেশে প্রথম মৃত্যু

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম

নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে নওগাঁয় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে দেশে এটিই প্রথম মৃত্যু বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে।

এদিকে নিপাহ ভাইরাসের মতো আরেকটি নতুন ও সম্ভাব্য প্রাণঘাতী বাদুড়বাহিত ভাইরাসের সন্ধান মিলেছে এক গবেষণায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে দেশের উত্তরাঞ্চলে এক নারী এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত ওই নারীর বয়স ছিল ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। ২১ জানুয়ারি তার শরীরে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়। যার মধ্যে ছিল জ্বর, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, মানসিক বিভ্রান্তি এবং খিঁচুনি। লক্ষণ দেখা দেওয়ার এক সপ্তাহ পর তিনি মারা যান এবং পরের দিন তার নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা জানান, ওই নারী নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বিষয়টি জানার পর পরীক্ষা করে তার শরীরে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গত ২৮ জানুয়ারি ওই নারীর মৃত্যু হয়।

দেশে নিপাহ ভাইরাসে সবশেষ মৃত্যু হয় গত বছরের আগস্টে। গেল বছর দেশটিতে চারজনের মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও দুই জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে সতর্কতা ও স্ক্রিনিং জোরদার করা হয়েছে।

তদন্তে জানা গেছে, ওই নারীর কোনো বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। তবে তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন।

আক্রান্ত নারীর সংস্পর্শে আসা ৩৫ ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তবে পরীক্ষায় তাদের সবার ফল নেগেটিভ এসেছে এবং এখন পর্যন্ত নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

নিপাহ ভাইরাস মূলত শূকর ও ফলখেকো বাদুড়ের মতো প্রাণী থেকে মানবদেহে ছড়ায়। এসব প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শে এলে বা এদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন।

মানুষের দেহে প্রবেশের পর এ ভাইরাস সাধারণত চার থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সংক্রমণের প্রাথমিক বিভিন্ন লক্ষণ হচ্ছে, তীব্র জ্বর, বমি বমি ভাব, বমি ও শ্বাসকষ্ট, যা পরবর্তীকালে নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে।

গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বিপজ্জনক প্রদাহ বা ফোলা তৈরি করে এই রোগ। যার ফলে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব ও খিঁচুনির মতো স্নায়ুবিক সমস্যা দেখা দেয়। এ ভাইরাস একজন থেকে অন্য কারও দেহে ছড়ানোর হার কম হলেও একে মহামারীর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

কারণ, এ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নেই। এর মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ, যা কোভিড-১৯-এর তুলনায় বেশি।

এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে ভাইরাসবাহিত রহস্যজনক এক রোগের সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুরুতে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব বলে মনে করা হলেও, এটি আসলে আরেকটি নতুন ও সম্ভাব্য প্রাণঘাতী বাদুড়বাহিত ভাইরাসের কারণে হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় এমন সতর্কবার্তাই দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে বাংলাদেশে পাঁচজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের উপসর্গের মধ্যে ছিলজ্বর, বমি, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ এবং স্নায়ুবিক সমস্যা।

এই পাঁচজন রোগীই কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। খেজুরের এই মিষ্টি রস বাদুড়েরও পছন্দের খাদ্য। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে বাদুড়কে একটি পরিচিত বাহক হিসেবে ধরা হয়। তবে এই পাঁচজনের কেউই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন নাপরীক্ষায় সবার ফল নেগেটিভ আসে।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রোগীরা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। কিন্তু তাদের মধ্যে তিনজন দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, শ্বাস নিতে অসুবিধা এবং হাঁটাচলায় সমস্যার কথা জানান। তাদের একজনের স্বাস্থ্য অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হয় এবং অজানা স্নায়ুবিক জটিলতায় ২০২৪ সালে তার মৃত্যু হয়।

এখন বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই রোগীরা আসলে পেটরোপাইন অরথোরিওভাইরাসে (পিআরভি) আক্রান্ত ছিলেন। এটি বাদুড়বাহিত আরেকটি ভাইরাস। এর আগে-জানা ছিল, বাদুড় বহু প্রাণঘাতী জুনোটিক ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার। এর মধ্যে রয়েছে র‌্যাবিস, নিপাহ, হেন্দ্রা, মারবার্গ এবং সার্স। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে পিআরভি সংক্রমণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে মৃদু ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে পাওয়া এই নতুন ঘটনাগুলোয় চিত্র ভিন্ন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত