চোখে সানগ্লাস। পরনে সাদা শাড়ি। আঁচলে আবৃত মাথার একাংশ। সামনে থেকে বেরিয়ে থাকা চুলও প্রয়াত খালেদা জিয়ার মতো। হাতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি-সংবলিত লিফলেট। ঢাকা-১৭ আসনের বনানী কামাল আতাতুর্ক মাঠের পাশে সড়কে লিফলেট দিয়ে ধানের শীষে ভোট চাচ্ছে সাত থেকে আট বছরের এই শিশুটি।
চলন-বলন সবকিছুতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অনুকরণের চেষ্টা। সঙ্গে তার বাবা-মাও আছেন। লিফলেট হাতে তুলে দিচ্ছেন আর বলছেন, ‘১২ তারিখ সারাদিন, ধানের শীষে ভোট দিন।’ শিশুটির বাবা যশোর জেলা যুবদলের সাবেক প্রচার সম্পাদক ইস্কান্দার আলী জনি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে এভাবে আমাদের আপসহীন নেত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার বেশে ঢাকা-১৭ আসনে ধানের শীষের প্রচার চালাচ্ছে।’
এই আসনটি এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়া তিনি নিজ জন্মস্থান বগুড়ার একটি আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ঢাকা-১৭ আসনে এবার ভোটার ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭০ হাজার ১১০ জন, নারী ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৩ ও হিজড়া ৮ জন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স. ম. খালিদুজ্জামান দাঁড়িপাল্লা, জাতীয় পার্টির আতিক আহমেদ লাঙ্গল, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির কামরুল হাসান নাসিম কাঁঠাল, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মনজুর হুমায়ুন আপেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনিসুজ্জামান খোকন ময়ূর, জাতীয় পার্টিজেপির তপু রায়হান বাইসাইকেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী এনায়েত উল্লাহ মোরগ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্যাহ হাতপাখা, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. শামীম আহমদ ডাব, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক আনারস, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) এস এম আবুল কালাম আজাদ টেলিভিশন প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১২ জন প্রার্থী থাকলেও ভোটাররা মনে করছেন এই আসনে লড়াই হবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জামানের। আর এ ক্ষেত্রে তারেক রহমানকেই এগিয়ে রাখছেন তারা।
গতকাল সোমবার ঢাকা-১৭ আসনের গুলশান-বনানী এলাকা ঘুরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রচার বেশি চোখে পড়েছে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে ঘুরে জামায়াত প্রার্থীর প্রচার খুব একটা দেখা যায়নি। অন্য প্রার্থীদেরও প্রচার তেমন একটা চোখে পড়েনি। দু-এক জায়গায় কাঁঠাল, হাতপাখা, সাইকেলের ব্যানার দেখা গেছে। বেশির ভাগ জায়গায়ই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যানারসহ বিভিন্ন প্রচারের উপকরণ রয়েছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘টিআর ১৭’, ‘ধানের শীষে ভোট দিন’, লেখা এবং তারেক রহমান ও ধানের শীষের ছবি-সংবলিত সাদা, লাল-সবুজের টি-শার্ট, ক্যাপ পরে প্রচার চালাচ্ছেন ধানের শীষের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। শুধু পোশাক নয়; প্রচারে রয়েছে লাল-সবুজ রঙের গাড়িও। কোথাও জিপে, কোথাও ট্রাকে, কোথাও রিকশায়, কোথাও হেঁটে চলছে প্রচার।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই আসনে ধানের শীষের জোয়ার উঠেছে। যেহেতু এখানে প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাই এখানকার ভোটাররা আগামীর প্রধানমন্ত্রীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেজন্য এই আসনের মানুষ বেশি উজ্জীবিত। তারা এই আসনটি বড় ব্যবধানে তারেক রহমানকে উপহার দেবেন। ভোটাররা মনে করেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে উন্নয়নের দিক থেকে এই আসন এগিয়ে যাবে। তার মতে, শুধু এখানে নয়; সারা দেশেই ধানের শীষের জোয়ার বইছে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে গুলশান-১ মোড়ে লাল সবুজ রঙের খোলা জিপে করে কয়েকজনকে ধানের শীষের সেøাগান দিতে দেখা গেছে। একটু এগিয়ে গুলশান-মহাখালী সড়কের পাশ দিয়ে কড়াইল বউবাজার এলাকায় যাওয়ার নৌকাঘাটের পাশে চায়ের দোকানে কথা হয় কড়াইল এলাকার এক বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি জানান, কড়াইল এলাকায় বিএনপি এবং জামায়াত প্রার্থীর অবস্থান সমান। অন্য প্রার্থীদের কোনো আলোচনা নেই। বেলতলা মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তারেক রহমানের গান বাজিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। এখানেও জামায়াত প্রার্থীর তুলনায় বিএনপি প্রার্থীর ব্যানার বেশি। আরেকটিু সামনে এগিয়ে দেখা যায়, সেখানে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘ধানের শীষে ভোট দিন’ লেখা সাদা এবং লাল সবুজ রঙের টি-শার্ট পরে অনেকেই বসে আছেন। পাশে জামায়াত প্রার্থীর ব্যানার লাগানো একটি ক্যাম্প অফিস। কিন্তু কোনো কর্মী-সমর্থক দেখা যায়নি। আরেকটু সামনে এগিয়ে টিএনটি এলাকা জুড়েই দেখা গেছে তারেক রহমানের পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে আছে। মোড় ঘুরতেই চোখে পড়ে একটি ট্রাকে করে নারীরা ধানের শীষের পক্ষে মিছিল করছেন।
এই আসনটি শুরু থেকেই আলোচনায় আছে জামায়াত প্রার্থী এস এম খালিদুজ্জামানের বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে। ‘ঢাকায় কোনো সিট দেব না, সব সাইজ হয়ে যাবে’ এমন মন্তব্য করে প্রথমেই সমালোচনার মুখে পড়েন। তিনি নিজেকে তারেক রহমানের চেয়ে যোগ্য দাবি করেন, জয়ী হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন।
বগুড়া-৬ : বগুড়া সদরের সীমান্ত এলাকা যশোপাড়া মোড়ে মিঠুর চায়ের দোকান। সেখানে চায়ের কাপে ভোটের আলাপ চলছে। নানাজনের নানা মতো। সেখানে ওই এলাকার বৃদ্ধ সিরাজ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন। তার আশা, ভবিষ্যতে দেশ যাতে ইসলামি মতে পরিচালিত হয়। কিন্তু তার কথা মানতে চান না অনেকে। বৃদ্ধ সিরাজের কথায় বাগড়া দিলেন চা-ওয়ালা মিঠু। তিনি বলেন, ‘ধর্মের ধান্দা বাদ দ্যাও চাচা। ধর্ম মনের বিষয়, তাক ভোটের মদ্দে আনবানা। বোগরার ছোল তারেক রহমান। তাক ভোট দিমো। ধানের শীষোত ভোট দিমো। এখনকার তারেক রহমান আর আগের মত লয়। এখন দেশ চলানের সব আচে তার মদ্দে। বোগরার উন্নয়নে তারেকোক লাগবি বুজলা।’
এমন ভোটের আলাপ সরেজমিনে চোখে পড়ল বগুড়া সদরের অন্যান্য এলাকাতেও। বগুড়া সদরের ভোটের উত্তাপ এবার অন্য রকমের। কারণ ঘরের ছেলে তারেক রহমান এবার এখানে প্রার্থী। তাকে রেকর্ড পরিমাণ ভোটে নির্বাচিত করতে মাঠেঘাটে দৌড়ঝাঁপ করছে জেলা বিএনপি নেতাকর্মীরা।
২০০৮ সাল পর্যন্ত সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন বিএনপির দখলে ছিল। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাপার নুরুল ইসলাম ওমর বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তিনি শপথ না নেওয়ায় উপনির্বাচনে বিএনপির গোলাম মো. সিরাজ বিজয়ী হন। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে পদত্যাগ করলে আরেকটি উপনির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু বিজয়ী হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়ী হন। দীর্ঘদিন ধরে এই আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বিএনপি এই আসনে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রার্থী করেছে।
এ আসনে তারেক রহমানের মূল প্রতিপক্ষ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল। এ ছাড়া এই আসনে তারা প্রতীকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আব্দুল্লাহ আল ওয়াকি, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের আবু নুমান মো. মামুনুর রশিদ ও মই প্রতীকে বাসদ মনোনীত প্রার্থী দিলরুবা নূরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দিলরুবা নূরী বগুড়ার সাতটি আসনের মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী।
সরেজমিনে রবি ও সোমবার বগুড়া সদরের পৌর এলাকা, সাবগ্রাম, ফাঁপোর, এরুলিয়া, শাখারিয়া, শেখেরকোলা, রাজাপুর, লাহিড়ীপাড়া, গোকুল, নিশিন্দারা, নুনগোলা, নামুজা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম বন্দর ঘুরে দেখা যায় ও ধানের শীষের প্রতিপক্ষ দাঁড়িপাল্লা। তবে অন্য প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও তাদের বেশির ভাগের জামানতই বাজেয়াপ্ত হবে বলে ধারণা করছেন সাধারণ ভোটাররা।
শেখেরকোলা গ্রামের আলু ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘ধানের শীষের বিকল্প নেই। হামরা বাড়ির সোগলি ধানের শীষোত ভোট দিমো।’ দাঁড়িপাল্লার অবস্থা কেমন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাকেরে ভোট বাড়ছে, বাড়ি বাড়ি ইসলামি তালিম করে ওরা। তাই মহিলারা বেশি দাঁড়িপাল্লাত ভোট দিবি। কিন্তু সে ভোটে পাশ হবিনে।’
