এবারকার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে গণভোট কেমন হবে, ফলাফলইবা কী হবে সেসব বিষয়ে দেশের নাগরিকদের যেমন আগ্রহ আছে, তেমনি আগ্রহ রয়েছে আন্তর্জাতিক বিশে^রও। এই নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে, কারা জয়ী হবে এগুলো নিয়ে রয়েছে অনেক হিসাবনিকাশ। বাংলাদেশের সঙ্গে স্বার্থের নানামুখী সম্পর্কে যুক্ত অধিকাংশ রাষ্ট্র আগামীকালের নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রত্যাশার ছক আঁকছে। সাধারণ বিদেশিদেরও এ নিয়ে রয়েছে নানা প্রত্যাশা। স্বার্থের বৈচিত্র্যের কারণে ভোটের ফল নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশার ভিন্নতা থাকলেও প্রায় সব দেশই চায় এবারের নির্বাচন মোটামুটি সহিংসতা ছাড়া, শান্তিপূর্ণ এবং কারচুপিমুক্ত হোক।
ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা তাদের প্রত্যাশার এ দিকটি সরকার, প্রধান রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে বাংলাদেশের নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গেও দেশগুলোর সরকারি কর্মকর্তাদের আলাপে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অবাধ, সুষ্ঠু, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যাশার দিকটি সর্বশেষ আসে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের আলাপে। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে জানায়, ‘নির্বাচনী নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে অন্তর্র্বর্তী সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত শুনেছেন।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কূটনীতিক জানান, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যে দলই সরকারে আসুক না কেন, তার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার কাজ করতে আগ্রহী।
ঢাকায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতীয় মিশনগুলোর কয়েকজন কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে জানান, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও কারচুপিমুক্ত হয় কি না এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ কেমন হয়, সেসব বিষয়ে তারা বেশি আগ্রহী।
বিদেশিদের এমন আগ্রহ ও আশাবাদ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রচার-প্রচারণার সময় সহিংসতা কম হওয়ায় বিদেশিদের আশাবাদ শক্তিশালী হয়েছে যে নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হবে।
তিনি বলেন, ‘দলগুলো এখন পর্যন্ত সহিংসতা উসকে দিচ্ছে না, এটা এবারের নির্বাচনে একটি ভালো দিক। আসলে সহিংসতার দায় কেউ নিতে চাচ্ছে না। মোটামুটি সংযত আছে সবাই।’
হুমায়ুন কবির, যিনি বর্তমানে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিইআই (বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট) প্রেসিডেন্ট, তিনি আরও বলেন, ভোটগ্রহণের দিন কিছু সহিংসতা হলেও হতে পারে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় থাকা এবং সামরিক বাহিনীগুলোর দায়িত্বের পরিধি কেন্দ্র পর্যন্ত বাড়ানোর কারণে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এই রূপান্তর সময়ের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক মার্কিন বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ^াসযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনা কম। সহিংসতা হলে মার্কিন স্বার্থ বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনের পর সহিংসতা কম থাকবে, এটাই প্রত্যাশিত।
বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কৌশলগত অবস্থানের দিকটি ভারতীয় বিশ্লেষকদের নজর এড়ায়নি। এ বিষয়ে দিল্লিভিত্তিক ভারতীয় বিশ্লেষক ড. ব্রহ্মা চেলানি গত সোমবার এক এক্স-পোস্টে বলেন, নির্বাচনে একটি বড় দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা ভারতের কৌশলগত আঙিনায় আমেরিকান ও ভারতীয় স্বার্থের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান পার্থক্যকে তুলে ধরে।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে।
ব্রহ্মা চেলানি মনে করেন, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজন গভীর হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে। দিল্লির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের ফল যাই হোক, বাংলাদেশে ইসলামপন্থি ও ভারতবিরোধী দলগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকায় দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অস্থিরতা ও অচলাবস্থা সহসা কাটার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের যোগাযোগ বাড়তে থাকা নিয়েও ভারতে উদ্বেগ আছে।
চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে বাংলাদেশে। দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে চলমান গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রতি তার দেশের সমর্থন আছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে, চীন এমনটি চায়।
তবে কুগেলম্যানসহ মার্কিন বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনুক, যাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানো যায়।
এবারকার ভোট কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকায় এর আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোর তুলনায় দৃশ্যপট অনেক বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়ার কারণে আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা চ্যালেঞ্জিং হিসেবে গণ্য করছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)।
আওয়ামী লীগের চিরবৈরী বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এবার সামনে এসেছে জামায়াতে ইসলামী ও তরুণদের দল এনসিপির ১১ দলীয় জোট।
সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ভারতে আশ্রিত আওয়ামী লীগ নেতারা নির্বাচন থেকে দূরে থাকার জন্য দেশে অবস্থানরত দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই নির্বাচনী কাজকর্মে যুক্ত হচ্ছেন। আইসিজি বিশ্লেষক থমাস কিন মনে করেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা যদি আদৌ ভোট দেয়, তারা কোন দলকে ভোট দেয়, তা ভোটের ফলাফলের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় বিদেশি পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি নামমাত্র হলেও এবার প্রায় ৪০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক নজর রাখছেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড মোট ২০০ পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে। নির্বাচনের কার্যক্রম, ভোট গণনা ও ফলাফল সংকলন পদ্ধতির ওপর তারা নজর রাখবেন। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে।
