‘ভোট ডাকাতি’ ঠেকানোর নির্দেশ জামায়াতের

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১০ এএম

প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিকভাবে দেশে সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়ার দাবি করছেন দলটির নেতারা। পাশাপাশি ভোটারদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চিন্তাও করছে জামায়াত।

এরই মধ্যে সরকারের রূপরেখার ইঙ্গিত মিলেছে নেতাদের বক্তব্যে। পলিসি সামিট করে জামায়াত সরকারে গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তার সম্পর্কে ব্যাখ্যা ও রূপরেখা তুলে ধরেছে। ইশতেহারেও দিয়েছে চমকপ্রদ সব প্রতিশ্রুতি। সব মিলিয়ে আগামীকালের নির্বাচনে জনসমর্থন নিজেদের পক্ষে থাকবে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। তবে মানুষের সেই সমর্থন যাতে কেউ ছিনিয়ে নিতে ॥না পারে, সেজন্য নিজেদের কর্মকৌশলের পাশাপাশি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে জামায়াত।

দলটির নেতারা বলছেন, সারা দেশেই মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। সবাই এবার পরিবর্তন চায়। জামায়াত মানুষের সেই চাওয়া পূরণ করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু মানুষের ম্যান্ডেট ছিনতাই করতে এরই মধ্যে কেউ কেউ ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তারা ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় যেতে চায়। সারা দেশের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের জনগণকে নিজেদের ভোট রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াত আমির। সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের ভোটের ফলাফল ঘোষণার আগপর্যন্ত মাঠে সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, এরই মধ্যে সব ধরনের নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ করেছে জামায়াতে ইসলামী। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী দলটি। তবে পাতানো নির্বাচন হলে ফল মেনে নেবে না দলটি। একই সঙ্গে কিছু আসনে সিসিটিভি ক্যামেরা কমিয়ে দেওয়ায় নিরাপত্তার আশঙ্কা করছে দলটি।

জানতে চাইলে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক দিন পরেই জনগণের বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন হচ্ছে, যা গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে না পেরে হতাশ হয়েছে। সে আলোকে ২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মানুষের আকাক্সক্ষার জায়গা। সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সামনে রেখে আমরা প্রার্থী নির্বাচন করেছি। তারা মাঠে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন। সবশেষ আমরা ১১-দলীয় জোট করেছি। তাদের সঙ্গে আমরা আসন সমন্বয় করেছি। আমরা জনগণের পক্ষ থেকে বিপুল সমর্থন প্রত্যাশা করছি।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে দেখছি তরুণ, নারীসহ সব জায়গা ভালো সমর্থন পাচ্ছি। আর মানুষও বলছে, ধানের শীষ, নৌকা সবাইকে দেখেছি। এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেব। বাস-ট্রেনেও অনেকেই দাঁড়িপাল্লার পক্ষে সেøাগান দিচ্ছে। আশা করছি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, নির্ভয়ে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে আমরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।

তিনি আরও বলেন, এখনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হামলা, মারধর ও ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের খবর পাচ্ছি। একটি দলের সন্ত্রাসীরা নির্বাচন বানচাল এবং মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে যেন ভোটকেন্দ্রে না আসে। আমরা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতা আশা করছি।

এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, জনমনে আতঙ্ক দূর করতে লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনকে আরও তৎপর হওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে ভোটের মাঠে প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও কঠোর হতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সব আসনে নির্বাচন করছে। এই জোটে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া নতুন জেনারেশন জেডের পার্টি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে দেওয়া কর্নেল (অব.) অলি আহমদের দল এলডিপি, কওমিপন্থি দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ইসলামীপন্থি ও ডানপন্থি দলগুলোকে নিয়ে ১১-দলীয় জোট গঠন করেছে। এর মধ্যে ২১৫টি আসনে বিএনপি জোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জামায়াতে ইসলামী। বাকি ৮৫টি শরিক দলকে দিয়েছে। এর মধ্যে এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২২, খেলাফত মজিলস ১২, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, নেজামে ইসলাম পার্টি ২, বিডিপি ২টি আসনে নির্বাচন করছে। তবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও লেবার পার্টি আসন ছাড়াই জোটে রয়েছে।

জোটের নেতারা বলছেন, গত ২০ দিনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর ৪৮টি জেলায় নির্বাচনী প্রচারে সফর করেছেন। এই জেলাগুলোতে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। নারী-পুরুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছে। এ গণজোয়ারে বলছে ১২ তারিখ সুষ্ঠু নির্বাচন বিজয় আসবেই। একই সঙ্গে তারা সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আত্মবিশ্বাসী। তবে নির্বাচনে বিশেষ একটি দলকে অনৈতিক সুবিধা দিতে কিছু আসনে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দেওয়ার শঙ্কাও দেখছেন তারা। নেতাদের অভিযোগ, সিসিটিভি কম থাকায় ওই কেন্দ্রগুলোতে সন্ত্রাস করার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কিছু আসনে সুবিধা দিতে কিছু জায়গায় পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা কমানো হয়েছে বলেও মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে নির্বাচনে সমতল ভূমি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একটি অংশ এখনো নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে জেতাতে পক্ষপাতিত্ব করছে। নির্বাচন কমিশনকেও (ইসি) তাদের কাছে দুর্বল মনে হচ্ছে। তাদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের দাবি জানাচ্ছেন নেতারা।

তারা বলেন, নির্বাচনের এখনো এক দিন বাকি রয়েছে। অথচ হামলা, ভাঙচুর, বাধা, ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া ঘটছে। সকাল পর্যন্ত দেশে জামায়াতের ১৫টি নির্বাচনী অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। গত ১৮ দিনে অন্তত ৪৬ আসনে জামায়াতের নারী কর্মীরা হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লাসহ শরিক দলের প্রতীকে ভোট চাইতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন তারা।

পত্রপত্রিকার সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে দলটি বলছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেটে লাথি মারাসহ অসংখ্য নারী কর্মীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন। প্রতিনিয়তই ভয়ভীতি দেখানোসহ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন নারীরা। ভোট দিতে গেলে বিভিন্ন মাধ্যমে নারীদের ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও গতকাল সারা দিন ব্যস্ত সময় পার করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ শীর্ষ নেতারা। গতকাল সকালে দলের মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ মিশনের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াত। এ সময় দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস ইজাবসের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে উভয়পক্ষের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করে ইইউ প্রতিনিধিদল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তারা একমত পোষণ করে। আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইইউর ২০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মাঠে কাজ করবে।

প্রচার না থাকলেও সারা দিনই বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। নির্বাচন পরিচালনা টিম, কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল, জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি আসনভিত্তিক খোঁজখবরও নিয়েছেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত