গৃহকর্মীর ব্যাপারে নবীজির সতর্কবার্তা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৮ এএম

মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় ক্ষমতার জায়গায় দাঁড়ালে। যখন কেউ কারও ওপর কর্র্তৃত্ব করে, তখনই বোঝা যায় তার অন্তরে কতটা দয়া, কতটা ন্যায়বোধ রয়েছে। যারা গৃহকর্মী, ঘরের ভেতর যারা নিঃশব্দে কাজ করে যায়, যাদের শ্রমে প্রতিদিনের জীবন স্বস্তিদায়ক হয়, তাদের প্রতি আচরণেই অনেক সময় ধরা পড়ে মানুষের প্রকৃত চরিত্র। অনেক গৃহকর্তা তার গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন চালায়, যা বর্বরোচিত কাজ। এ বিষয়ে রয়েছে নবীজির কঠোর সতর্কবার্তা।

প্রাচীনকালের দাসপ্রথা মানবসমাজ থেকে বিদায় নিলেও সম্পদশালীদের নিগ্রহ থেকে গরিব মানুষের মুক্তি মেলেনি। দরিদ্র জনগোষ্ঠী পেটের জ্বালায় ধনিক শ্রেণির যাবতীয় কাজকর্ম আঞ্জাম দেয় কায়িক শ্রমের মাধ্যমে দুমুঠো খাবার জোগাড় করার তাগিদে। বিত্তবানদের দৈনন্দিন জীবনে বিলাসিতার যাবতীয় বিষয়ের আঞ্জাম দিতে হয় তাদেরই। বাজার করা, খাবার তৈরি, খাবার পরিবেশন, থালা-বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করা এবং কাপড় কাচা থেকে নিয়ে এমন কাজ নেই, যা তাদের করতে হয় না। অথচ তিনবেলা খাবার সম্মানজনকভাবে তাদের কপালে জোটে না। বেতন বা পারিশ্রমিকের কথা না হয় বাদই দিলাম। উপরন্তু ভদ্রবেশীর অশ্রাব্য গালি তাদের হজম করতে হয় আশীর্বাদ হিসেবেই।

গৃহকর্মীদের ওপর গৃহকর্তার শারীরিক নির্যাতনের খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, যা একটি জাতির হীনতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। অথচ ইসলাম এসেছে দরিদ্র মানুষের কাঁধে চড়ে। আর মহান আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাত লাভের বড় মাধ্যমও ওই দরিদ্র জনগোষ্ঠী। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতে গিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যুদান করুন এবং মিসকিনদের দলের সঙ্গে আমার হাশর করুন। তখন হজরত আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! কেন? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! মিসকিনরা ধনীদের থেকে ৪০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা! তুমি কোনো মিসকিনকে আমার দরজা থেকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। অন্তত একটি খেজুর হলেও তাদের দিয়ো। হে আয়েশা! মিসকিনদের ভালোবেসে তাদের নিজের কাছে স্থান দিয়ো। তাহলে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তোমাকে নিজের কাছে স্থান দান করবেন।’ (তিরমিজি)

গৃহকর্মীরা বাড়ির সব সদস্যের খাবার শেষে তাদের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করবে, গৃহকর্তার ছেলেমেয়ের কাপড় বাতিল হয়ে গেলে তা তারা পরবে, আর সিঁড়িঘর, রান্নাঘর অথবা দরজার এক কোণে মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমাবে, অসুখ হলে ধুঁকে ধুঁকে মরবে, এটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইসলামের বিধান হলো, বাড়ির অন্য সদস্যের মতো তাদের বেলায়ও একই ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘তোমরা অধীনস্থ ভৃত্য ও মজুরদের সম্পর্কে সাবধান থাকবে! তোমরা যা খাবে তাদেরও তাই খেতে দেবে। আর তোমরা যেমন পোশাক পরবে, তাদেরও তেমন পোশাক পরতে দেবে।’ (সহিহ বুখারি)

নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হলো, অধীনস্থদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির মানুষের বিবাদী হবো। এক. ওই ব্যক্তি, যে আমার নামে প্রতিজ্ঞা করার পর তা ভঙ্গ করে। দুই. ওই ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে। তিন. ওই ব্যক্তি, যেকোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার কাছ থেকে কাজ পুরোপুরি আদায় করে নেয়, কিন্তু তার পারিশ্রমিক ঠিক মতো দেয় না। (সহিহ বুখারি)

মানুষের জীবনের প্রয়োজনেই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার উদ্ভব হয়েছে। দরিদ্ররা আর্থিক প্রয়োজনে ধনীদের দ্বারস্থ হয়, কিন্তু ধনীদের জীবনের একটি প্রহরও চলতে পারে না গরিব মানুষের সহযোগিতা ছাড়া। এই যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, এটিই সামাজিক বন্ধন। আর এ বন্ধনটি যদি আন্তরিকতা ও মানবিক বোধের দ্বারা সংরক্ষিত হয়, তাহলেই সামাজিক শান্তি স্থায়ী রূপ পায়। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও শ্রেণিতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিতি অর্জন করতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত