রাজধানীতে প্রতিটি মুহূর্তে ব্যস্ততা, অবিরাম দৌড়। তার ওপর যদি মাছ আবার বাসায় এনে নিজের হাতে কাটতে হয়, তবে কর্মজীবী পরিবারের ভোগান্তি আরও বাড়ে। ঢাকাবাসীর এই ঝামেলা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে বাজারে বসা পেশাদার মাছ কাটিয়ারা। ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই পেশা। ফলে মাছ কাটা পেশায় আয়ও বেড়েছে। মূলধন বলতে একখানা বঁটি। এই আয় বৃদ্ধি মাছ কাটিয়াদের জীবনে নিয়ে এসেছে আরেক শঙ্কা। তৈরি হয়েছে মাছ কাটার যন্ত্র। ফলে যন্ত্রের কাছে কাটিয়াদের জীবিকা পড়েছে হুমকির মুখে।
প্রতি শুক্রবার কারওয়ান বাজারে কদর বেড়ে যায় মাছকাটিয়ার। সকালে বসে দুপুরের আগেই সাত থেকে আটশ টাকা উঠে যায়। সেদিন দম ফেলার ফুরসতও মেলে না তার। আবার মাছের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও অনেকেই সে সময় বেশি করে মাছ কেনেন। তবে অন্য দিনগুলোতে অবস্থা মাঝারি থেকে কম। কখনো সারা দিনে দুই-তিনশ টাকাই ভরসা। তবে তাদের দৈনিক গড় আয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। অনেকের আয় আবার এর চেয়েও বেশি।
এ বাজারের এমন একজন মো. মামুন, বয়স ৩০ বছরের মতো। মাছ কাটা পেশায় যুক্ত আছেন একযুগ ধরে। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, পুঁজিবিহীন এ পেশায় শুধু বসার জায়গাটি ভাড়া নিতে হয়। আর প্রয়োজন হয় একটি বঁটির। এ পেশায় নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই। সকাল থেকে বিকেল অবধি মাছ কাটার কাজ করি। এতে দৈনিক ১ থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয়।
মাছ কাটার পারিশ্রমিক বিষয়ে মামুন বলেন, ‘মাছের প্রকারভেদ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। ছোট মাছ কাটতে কষ্ট বেশি হওয়ায় পারিশ্রমিক বেশি নেওয়া হয়। তাছাড়া নির্দিষ্ট কোনো পারিশ্রমিক নেই। ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করে ঠিক হয়।’
একই চিত্র দেখা যায় মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারে। এখানে মাছের বাজার জমে ওঠে সন্ধ্যার পর। এ বাজারে মাছ কাটেন কিশোর রাগিব হাসান। বেশ কয়েক বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়নি। ২০ টাকা কেজি দরে মাছ কাটে রাগিব। তবে মাছের ধরন অনুযায়ী মূল্য বদলায়। ট্যাংরা মাছ কেজিপ্রতি ৬০ টাকা লাগে, আর রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প কাটা যায় ২০ টাকা কেজিতে। সব মিলিয়ে রাকিবের দৈনিক আয় এখন প্রায় ৪০০ টাকার মতো।
এদিকে মহাখালী বাজারের মাছকাটিয়া রহিম শেষ প্রতিদিন আয় করেন প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ টাকা। পজিশন বাবদ বাজারে ২০০ টাকা দিতে হয়। তিনি বলেন, ‘এখন আয় ভালো, কিন্তু প্রথম দিকে এমন ছিল না। তখন বাজারে মাছ কাটাতে লোক আসতও কম, সময়ের সঙ্গে পেশা বদলেছে, কাজ বেড়েছে, সঙ্গে রোজগারও।’
স্বাধীনভাবে মাছ কাটেন তিনি। ছোট মাছ কেজিপ্রতি ৪০-৬০ টাকা, আর বড় মাছ কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা নেন। তবে বাজারে এমন অনেকে আছেন যারা মহাজনের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করেন। তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকায় কাজ পান, তবে লাভ বেশি হলে মুনাফার অংশ দিতে হয়।
মেশিনের কাছে পেশার অনিশ্চয়তা : একসময় পুঁজিবিহীন থাকা এই পেশায়ও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। চীনারা তৈরি করেছে মাছ কাটার জন্য বোনস মেশিন। যেখানে একজন পেশাদার মাছ কাটিয়া প্রতিঘণ্টায় মাছ কাটেন ১৫ থেকে ২০ কেজি সেখানে মেশিনে ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত মাছ কাটা যায়।
বসিলা সিটি হাউজিং বাজারের মাছকাটিয়া সাবেকুন নাহারের বয়স এখন ৪৬ বছর। তিনি জানান, যখন কাজ শুরু করেছিলেন, কেজি পাঁচ টাকায় মাছ কাটতেন। এখন কেজি ২০ টাকা বা ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত নেন। বিয়েবাড়ি বা অনুষ্ঠানের সময় মাছ কাটার ডাক পড়ে তার। তবুও পেশায় অনিশ্চয়তা আছে বলেই চায়ের দোকান খোলেন।
অনিশ্চয়তার কথা জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সব কিছু এখন মেশিনে কাটা যায়। শত শত মাছ মুহূর্তেই কাটা হয়ে যায়। আগে প্রতিমাসে কয়েকটি বিয়েতে ডাক পড়ত, এখন একটাও পড়ে না।’
জানা গেছে, দুই ধরনের বোনস মেশিন বাজারে রয়েছে। প্রথমটি টেবিল টপ টাইপ মেশিন, অর্থাৎ সাইজ ছোট। আরেকটি টেবিলের ওপর রেখে ব্যবহার করতে হয় অর্থাৎ সাইজ বড় হয়। বিভিন্ন সুপার শপে মেশিনের বেশি ব্যবহার ছিল। এখন বড় বড় কাঁচাবাজারে মেশিনগুলোর ব্যবহার শুরু হয়েছে।
গতকাল রবিবার সকালে মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে মেশিনেই মাছ কাটেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের একজন শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সবাই মেসে থাকি। ব্যস্ততা থাকে। প্রতি সপ্তাহের মাছ কিনলেই এখন থেকে মেশিনেই কাটিয়ে নিই। দ্রুত কাটা হয়ে যায়।’
বোনস মেশিন বিক্রি করে নবারুণ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি রবিন আহসান জানিয়েছেন, আমাদের দেশে ৯০ ভাগ বাজার দখল করে নিচ্ছে চায়নার তৈরি বোনস মেশিন। বিয়েসহ বড় বড় ইভেন্টে দ্রুত মাছ ও মাংস কাটার জন্য এর চাহিদা বাড়ছে। দেশের বড় কাঁচাবাজারগুলো থেকেও এই মেশিনের ক্রয় আদেশ পাচ্ছি।
মাছ কাটার এই পেশা একসময় প্রান্তিক মানুষের উপার্জনের ক্ষুদ্র পথ ছিল। পরে তা বহু মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। এখন আয়ের উৎস ভাগ বসাচ্ছে চায়না মেশিন।
