দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে গরু ও মুরগির মাংস, মাংস থেকে তৈরি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ব্যবসায় স্থানীয় উৎপাদকদের মতোই ব্যবসার অবাধ সুযোগ চায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) পাল্টা শুল্কের চুক্তিতে এসব বিষয়ে কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ এসব ধারায় সম্মতি দিয়েই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে গত ৯ ফেব্রুয়ারি তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তি স্বাক্ষর করে।
ইউএসটিআরের প্রকাশিত অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড শীর্ষক চুক্তিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে প্রাণিসম্পদ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশ কিছু পণ্যের রপ্তানির অবাধ সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে প্রথমেই বলা হয়েছে দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানির অনুমতি প্রদান। গরু, ছাগল বা ভেড়া থেকে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের আওতায় থাকা ‘এগ্রিকালচার মার্কেটিং সার্ভিস (এএমএস)’-এর যে স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে সেটাকেই
স্বীকৃতি দিতে হবে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কোনো স্থাপনা নিবন্ধন সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা দেওয়া যাবে না।
একইভাবে দেশটি যে কোনো ধরনের মাংস (গরু, মুরগি), নাড়িভুঁড়ি-সহ মুরগির মাংস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, কিছু মাছ এবং ডিম জাতীয় পণ্য রপ্তানি করবে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের যে মানদ- রয়েছে তা মেনেই রপ্তানির সুযোগ দিতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ আলাদা কোনো নিবন্ধন ব্যবস্থা বা শর্ত আরোপ করতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে পণ্য রপ্তানি করবে সেভাবেই বাংলাদেশকে আমদানির অনুমতি দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণিজ পণ্য সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত করে দেশে আমদানি হয়ে এলে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা উৎপাদনকারীদের ওপর কোনো চাপ তৈরি হবে কি না সে বিষয়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তারা চুক্তি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার আগে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এর মধ্যে এক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরাসরি মুরগির মাংস রপ্তানি করলে সেটা সেক্টরে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কারণ তাদের মাংসের দাম দেশের তুলনায় বেশি। তবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজারের বিষয়গুলো আরও বিশ্লেষণ করতে হবে।’
তবে উদ্যেক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে পোলট্রি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। এই খাতের উৎপাদন দিয়েই দেশের মুরগির মাংস এবং ডিমের চাহিদা পুরোপুরি মিটছে। এর জন্য আমদানির প্রয়োজন নেই। একই অবস্থা গরুর মাংসের উৎপাদনেও। তবে গরুর মাংসের দাম বেশি হওয়ায় ভোক্তাদের ক্ষোভ রয়েছে। তারা আরও কম দামে গরুর মাংস খেতে চান। যদিও ব্রয়লার মুরগির মাংস ও ডিমের দাম বছরের বেশিরভাগ সময়েই স্বাভাবিক থাকে।
মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে পোলট্রি খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মাংস ও ডিমের উৎপাদনই নয়, একদিনের বাচ্চা থেকে শুরু করে এ খাতের খাবার উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও খাদ্য উৎপাদনের অনেক উপাদান এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ খাতের বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগকারীরা শুধু মাংস ও ডিম উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারেও ভালো বিনিয়োগ করেছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান অবশ্য চুক্তির বিষয়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘এ চুক্তির মধ্য দিয়ে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগও রয়েছে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এ চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা মূল্য প্রক্রিয়াজাত প্রাণিজ খাদ্যের ব্যবসা বাড়াতে চাইবে। এই তালিকায় দুগ্ধজাত ও মাংস দিয়ে উৎপাদিত পণ্যই রপ্তানি করতে চাইবে। কারণ তারা যে মাংস রপ্তানি করবে সেটাও প্রক্রিয়াজাত করেই করবে।
এদিকে এই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান একাধিক বৈঠক করেছেন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের সঙ্গে। যে বৈঠকে আমেরিকা ও ব্রাজিল থেকে গরুর মাংস আমদানি উন্মুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা এতে রাজি হননি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, সরাসরি মাংস আমদানি করার অনুমতি প্রদান করলে দুটো ক্ষতি হতে পারে। দেশে তৈরি হওয়া প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর বড় চাপ আসতে পারে। অন্যদিকে মাংস আমদানির মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে রোগজীবাণু আসার চান্স তৈরি হবে। এ কারণেই গরুর মাংস আমদানির অনুমতি প্রদান করা হয়নি।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে ইতিমধ্যেই ব্যাপক হারে গম আমদানি শুরু করেছে। সে দেশ থেকে ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়েও চুক্তি করেছে। এছাড়া সয়াবিন, তুলাসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানির জন্য ইতিমধ্যেই সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। যে কারণে চূড়ান্ত চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তি সম্পন্ন হলেও এ বিষয়গুলোর চূড়ান্ত কার্যকারিতা শুরু হবে দুই দেশের প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে।
