জামায়াত-এনসিপির সহযোগিতা চান তারেক রহমান

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

আগামী দিনে সরকার পরিচালনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতা চাইলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পরিচালনার কথা জানান তিনি। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাসায় গিয়ে এ কথা জানান তারেক রহমান। সেখানে উপস্থিত থাকা বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ দিকে সাক্ষাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে জামায়াত আমির বলেছেন, ‘এ সাক্ষাৎ পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে। জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করব।’

পরে বিএনপি চেয়ারম্যান কাকরাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় যান। আগামী দিনে সরকার পরিচালনায় এনসিপির সর্বাত্মক সহযোগিতা চান তিনি।

তারেক রহমানের এ পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সরকার গঠনের আগে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি বিরল। কেউ কেউ বলছেন, এটি রাজনৈতিক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ এটি খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। তিনি (তারেক রহমান) একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিজয়ী দল হিসেবে, নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যে সৌজন্যবোধ দেখিয়েছেন, এটা আমি মনে করি রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন। দেশের রাজনীতিতে এ ধরনের ঘটনা বিরল। তিনি উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের দেশের রাজনীতিতে এই উদারতার বড়ই অভাব। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমান ব্যতিক্রম। এটা তার খুবই ভালো দিক। এতে বোঝা যায়, তিনি এক সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আমাদের রাজনীতি, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জন্য এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৯ মিনিটে তারেক রহমান জামায়াত আমিরের বাসায় পৌঁছালে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জামায়াত নেতারা। সাক্ষাৎ শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দুই শীর্ষ নেতা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।’

এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং জামায়াত আমিরের সঙ্গে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়ে বিএনপির ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে ইতিবাচক রাজনীতির সূচনার অংশ হিসেবে জামায়াত আমিরের বাসায় গেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে অভিনন্দন : তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াত আমির ফেসবুকে এক পোস্টে বলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তার এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।

তিনি লিখেন, ‘আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। আমাদের আলোচনায় তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’

জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করব, তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহিতার প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব। আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সাক্ষাতের পর জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। আমরা একসঙ্গে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। সরকার এবং বিরোধী দল মিলে একসঙ্গে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করব। জনগণের কল্যাণে যেকোনো বিষয়ে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব। জামায়াত ইসলামী কোনো জাতীয় সরকারে অংশ নেবে না। শক্ত বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে।’ সাক্ষাতে আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সরকার যেন নজর দেয় এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন জামায়াত আমির।

এরপর রাত পৌনে সাতটার দিকে জামায়াত আমিরের বাসা থেকে বের হয়ে জামায়াত জোটের সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাকরাইলের বাসার উদ্দেশে রওনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। রাত ৮টা ২৭মিনিটে নাহিদ ইসলামের বাসায় পৌঁছালে তাকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান এনসিপি নেতারা। এ সময় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং দলটির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম উপস্থিত ছিলেন।

দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দিক-এনসিপি : তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সৌজন্য সাক্ষাৎ দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।’

বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় এনসিপি নেতাদের যোগদানের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না। এ ধরনের কোনো আলোচনা আজকের বৈঠকে হয়নি।’

আখতার হোসেন আরও বলেন, ‘চব্বিশের অভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাদের পরিবার ও পুনর্বাসন নিয়ে আমরা কথা বলেছি। এনসিপি আহ্বায়ক ফুল দিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ সময় শাপলা কলির একটি কাঠামো এবং একজন শহীদের হাতে লেখা একটি চিঠি তাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। এই সাক্ষাৎ রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।’

এবার ভোটে জামায়াত জোটের সঙ্গী ছিল জুলাই আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে গঠিত দল এনসিপি। বিএনপি চেয়ারম্যান এ দলের আহ্বায়ক ও অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের বাসাতে যাবেন বলে গত শনিবার জানানো হয়েছিল। যাওয়ার আগে বিএনপির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দুই নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘ইতিবাচক রাজনীতির অংশ হিসেবে’ এই সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। জামায়াত ৬৮ ও এনসিপি ৬ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান হবে।

এর আাগে গত শনিবার বিকেলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সংবাদ সম্মেলনে আসেন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সেখানে তিনি বাংলাদেশকে বিনির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান রাখার পাশাপাশি সহযোগিতা চেয়েছেন।

লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর এই প্রথম বিএনপি চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলনে এলেন। তার আগে তিনি সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত